Sunday, October 7, 2018

রোগ কাহিনী -৩৪ঃস্যার বাংলাদেশের বড় বড় ডাক্তাররা বলে তোমার কোন রোগ নাই, সিঙ্গাপুরের ডাক্তার দেরি না করে বলে তোমার মানসিক রোগ-সর্বাঙ্গে ব্যথা-অষুধ দেবো কোথা

কাহিনী সংক্ষেপঃ
আজাদ সাহেব, বয়স ৪৬ বছর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।১০ বছর যাবত তিনি এই রোগে ভুগছেন।

বিয়ের আগ থেকেই উনার সমস্যা দেখা দেয় যে উনি একা ঘরে ঘুমাতে ভয় পেতেন এবং এর জন্য সব সময় সঙ্গে লোক নিয়ে ঘুমাতে হতো।
তার এই ভয় এখনো আছে।বউ ছাড়া একা ঘুমাতে পারেন না।

এর কিছু দিন পর তিনি শরীরে চিন চিন ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন,ক্রমশ যা অসহ্য যন্ত্রনায় রূপ লাভ করে।

পুরো শরীরই যন্ত্রনা করতো। তবে বেশি হতো হাতে। দিনে মোটামোটি থাকতো, এমনকি ঘুমাতে যেতো ভালই। কিন্তু মাঝ রাতে বা শেষ রাতে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে জেগে যেতো।

এরপর আর ঘুম আসতো না।বউকে বলতো শরীর টিপে দিতে। বউ সারা রাত হাত পা শরীর টিপতে থাকতো। সকাল ৯-১০ টার দিকে ক্লান্ত হয়ে সে ঘুমিয়ে পরতো।

তিনি আরো জানান শরীরে শক্তি পাই না,ভারী কিছু হাত দিয়ে উঠালেও হাতে টের পাই না,মাংসপেশিতে চাপ লাগে না।
টেনশন করলে যন্ত্রনা বাড়ে তবে কাজ করলে ভাল থাকি। ঘুম হয় না,অস্হির লাগে।

একসময় ব্যথা তীব্রতর হয়।সীমাহীন যন্ত্রনা।

দেশের বিখ্যাত সব মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, নিউরো বিশেষজ্ঞ, হাড়-বাত বিশেষজ্ঞ গনকে দেখানো হয়।এ হেন টেস্ট নাই করা হয় নাই।

কিন্তু বড় বড় ডাক্তাররা বলে রিপোর্ট ভাল, আমার কোন রোগ নাই।

এরপর আত্মীয়দের পরামর্শে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান। সেখানকার ডা. তাকে দেখে বলেন,আপনার ঐ ধরনের মারাত্মক কোন রোগ হয়নি। তেমন হলে এতো দিনে মারা যেতেন,সিঙ্গাপুরে আর আসতে পারতেন না

আপনার এটি মানসিক রোগ।

তিনি মাত্র একটি ঔষধ লিখে দেন( পারক্সেটিন- যা একটি এন্টিডিপ্রেসেন্ট)।

এই একটি ট্যাবলেট খেয়েই তিনি ২-৩ বছর ভাল ছিলেন।
কিন্তু এখন আবার ও সে যন্ত্রনা ফিরে এসেছে।

তবে টাকার অভাবে সিঙ্গাপুর যেতে পারছেন না এবং ঐ আগের ঔষধে তেমন কাজ করছে না।

আমাকে বললো, স্যার আপনার অনেক সুনাম শুনে এসেছি, আপনি নাকি ভাল কাউন্সিলিং করেন।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম ঐ যন্ত্রনার সময়ে আপনার মন কেমন থাকতো? 

তিনি বলেন -অস্থির, অশান্তি লাগতো।বউ বলে খিটখিটে মেজাজ হয়ে যেতো।
মনে আনন্দ, ফুর্তি থাকতো না;
কাজে আগ্রহ পেতো না,
ঘুম হতো না;
কোন কিছু নিয়ে ভাবলে ব্যথা শুরু হতো ও বেশি হতো ;
(যেমন-কেউ খারাপ ব্যবহার করলে, কেউ খামোখা ঝগড়া বাধালে,বউ বাচ্চাদের বকা দিলে বা সংসারের কাজে অবহেলা করলে) ।

বউ বলে-
সে দায়িত্বের প্রতি সিরিয়াস ;
নিয়ম কানুন না মানলে ক্ষেপে যায়;
বাচ্চাদের ধমক দিতে দেয় না,
সময় মতন কাজ না করলে রেগে যায়
এবং বাচ্চাদের ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাবে বলে উদ্বিগ্ন থাকে।
তবে একটি ব্যতিক্রমী লক্ষণ তিনি উল্লেখ করেন যে, ঐ যন্ত্রনার সময়ে ও ওনার যৌন চাহিদা বেশি থাকে, যা তার বউও স্বীকার করে।

কেইস হিস্ট্রি থেকে কি শিখলাম?

১। মানসিক রোগ মানে তথাকথিত পাগলামি নয়।সবদিক থেকে স্বাভাবিক মানুষ ও মানসিক রোগী হতে পারে। মানসিক রোগীদের মাত্র ১% সাইকোসিস বাকি ৯৯% হচ্ছে এরকম স্বাভাবিক মানুষ।

২। ব্যথা - মানসিক রোগের একটি অন্যতম  লক্ষণ।

অনেক মানসিক রোগে শারীরিক ব্যথা /যন্ত্রনা থাকতে পারে। বিশেষ করে ডিপ্রেশন, সোমাটোফরম পেইন ডিজঅর্ডার এ এরকম দীর্ঘ স্হায়ী ব্যথা থাকে

৩। কেউ শারীরিক সমস্যা / লক্ষণ নিয়ে দিনের পর দিন ভুগছে,
অনেক ডাক্তার দেখাচ্ছে, কিন্তু তেমন ভাল ফল পাচ্ছে না,
যাবতীয় দামী দামী টেস্ট করেও ডাক্তার বলছে রিপোর্ট ভাল, কোন রোগ নাই---

এমন ক্ষেত্রে নিজেই বুঝে নিবেেন এটি একটি মানসিক রোগ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

৪। ৩ এর মতন রোগীদের কোন রোগ নাই বললে যেমন অন্যায় হবে, তেমনি এটি রোগকে জটিল করে তুলবে ও রোগীকে আত্মীয়দের কাছে তাকেছোট করা হবে।

মানুষ যে লক্ষণ নিয়েই আসুক,সেটি তার সমস্যা ও রোগ।
সেটি শারীরিক রোগ না বলে,টেস্ট ভাল বলে, এটি কোন রোগ নয় বলা অন্যায়।
ডাক্তাররা এমন ভুল করলে রোগীদের যন্ত্রনা শুধু দীর্ঘ স্হায়ী হয় তা না,বিদেশে আমাদের ডাক্তারদের বদনাম ও হয়।একারনে কিছু রোগীর কাছে আমরা আস্হা হারাই।

৫। ঐ রোগীর "অবসেশনাল" ব্যক্তিত্বের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে
(অতিরিক্ত দায়িত্বশীল,নিয়ম কানুনে অনড়,অনিয়ম দেখলে ক্ষিপ্ত হওয়া)।

অবসেশনাল ব্যক্তিদের " পারফেক্ট " হওয়ার প্রবনতা থাকে এবং এদের মধ্যে ডিপ্রেশন হওয়ার ও দীর্ঘ স্হায়ী আবেগ -আচরণ গত সমস্যা ( সাইকোজেনিক পেইন) ঝুঁকি বেশি থাকে।

৬। উনি ডিপ্রেশন এর রোগী। পুরো শরীরে ব্যথা বলে ডাক্তাররা এই রোগের চিন্তা মাথায় আনেনি। অথচ ডিপ্রেশনে বিভিন্ন রকমের শারীরিক লক্ষণ থাকতে পারে,বিশেষ করে বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা এর অন্যতম একটি লক্ষণ
৭। ডাক্তাররা  ও সমাজ শারীরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়,মানসিক সমস্যাকে নয়।একারনে রোগীদের মধ্যে মানসিক যন্ত্রনা শারীরিক লক্ষণ হয়ে প্রকাশ পায়।একে বলা হয় " সোমাটাইজেশন"। আমাদের মতন উন্নয়নশীল দেশে তাই বেশির ভাগ মানসিক রোগী শারীরিক সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে হাজির হন।

Friday, October 5, 2018

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাঃপর্ব-২

বর্তমানে আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেটি খুবই গতিশীল, যেখানে স্বার্থপরতা,সহিংসতা, আত্মার দারিদ্র্যতা সমাজ জীবনের যেটুকু ভালো ছিল তাও অবলুপ্ত করে দিচ্ছে। এ কারনে আমাদের সেন্টিমেন্ট, চরিত্র ও সহজাত নৈতিক প্রবৃত্তি গুলো ক্ষয় প্রাপ্ত হচ্ছে।

মানব জীবনের  নৈতিক গুনাবলি গুলো আসে এর পিছনের আবেগীয় ক্ষমতা থেকে।

যারা আবেগ তাড়নার স্রোতে ভেসে যান,সহজে আবেগ তাড়িত হন,যারা আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম - তাদের রয়েছে "নৈতিকতার ঘাটতি "।

এই আবেগ তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হচ্ছে ইচ্ছা শক্তি এবং এটি চরিত্রের মূল ভিত্তি।

একই ভাবে " পরহিতব্রততা"(এলট্রুয়িজম) এর মূল উৎস হচ্ছে " সমব্যথী "(এমপ্যাথি) হওয়ার ক্ষমতা বা অন্যর আবেগ অনুভূতি সঠিক ভাবে পাঠ করতে পারা ও তাদের অবস্থান থেকে তাদের কষ্টকে অনুভব করা।

যদি আমরা অন্যের চাহিদা প্রয়োজন কি তা বুঝতে না পারি, তাদের হতাশা,নৈরাশ্যের কারন বুঝতে না পারি, তাহলে কিভাবে আমরা তাদের যত্ন নেবো,দায়িত্ব নেবো?

আমাদের বর্তমান এই অস্হির , জটিল ও স্বার্থ -কেন্দ্রীক সমাজে দুটি নৈতিক গুন থাকা সময়ের দাবি। সেগুলো হচ্ছে ঃ
১। আত্ম-দমন/আত্ম সংবরন এবং ২।  দয়া,মায়া,করুনা,সমবেদনা ( কমপ্যাশন)

গবেষণায় দেখা গেছে  বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা আগের যেকোন সময়ের তুলনায় অধিকতর দুর্দশাগ্রস্ত;
তারা অধিক বিচ্ছিন্ন, একাকী;
অধিক হতাশ, বিষন্ন,;
অধিক ক্রোধান্বিত, উচ্ছৃঙ্খল, অবাধ্য ও দুর্দান্ত;
অধিক নার্ভাস /উদ্বিগ্ন 
এবং আবেগ তাড়িত ও আগ্রাসী হওয়ার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ন।

তাহলে এর সমাধান কি?

সমাধান নির্ভর করে এদেরকে তরুণ বয়সে আমরা কিভাবে প্রস্তুত করি তার উপর।

বর্তমানে আমরা শিশুদের আবেগীয় শিক্ষা ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু এর সমাধান হবে স্কুলে সকল শিশুকে কিভাবে হ্রদয় ও আত্মাকে ( হার্ট এন্ড সৌল) একত্র করা যায় সে নিয়ে শিক্ষা দিলে।

এরিস্টটলের দার্শনিক জিজ্ঞাসা ছিল সদগুন(ভার্চু),চরিত্র ও ভালত্ব  নিয়ে।

তার চ্যালেঞ্জ ছিল বুদ্ধি দিয়ে আমাদের আবেগীয় জীবনকে ম্যানেজ করা।
আমাদের তীব্র অনুভূতি, প্রবল অনুরাগ(প্যাশন) যদি যথেষ্ট পরিশীলিত,অনুশীলন/চর্চা করা হয়, তখন সেটি প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত হয়।

এই প্রজ্ঞা আমাদের চিন্তাকে,মূল্যবোধকে ও আমাদের অস্তিত্বকে গাইড করে।
তবে এগুলো সহজে ভেস্তে যেতে পারে এবং এই ভেস্তে যাওয়া যখন তখন হতে পারে।

এরিস্টটলের মতে  সমস্যা আবেগের মধ্যে নয়,বরং আবেগের "যথার্থতা/যথোচিত হওয়া " এবং আবেগ প্রকাশের ধরনের উপর নির্ভর করে

।প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে আমরা "বুদ্ধিকে" আবেগের কাছে আনতে পারি, 
কিভাবে "ভদ্রতা" (সিভিলিটি) কে জন পথে
ও কেয়ারিং কে সমাজ জীবনে আনতে পারি।

যথোচিত আবেগ বলতে কি বোঝায়?

এরিস্টটলের সে বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করুন ঃ

" যে কেউ রেগে যেতে পারে -(এবং)  এটি সহজ।

কিন্ত সঠিক মানুষের সঙ্গে,
সঠিক মাত্রায়,
সঠিক সময়ে,
সঠিক উদ্দেশ্যে
এবং সঠিক পদ্ধতিতে রাগা-
(মোটেই)  সহজ কাজ নয় "।

(৩য় পর্ব-আসছে)

Tuesday, October 2, 2018

তরুনদের মানসিক স্বাস্থ্য

কেমন আছেন আমাদের তরুনরা?
প্রশ্নটি রাস্ট্র, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার সবার প্রতি। অন্তত পরিবার কি খোঁজ নেয় তাদের যুবা বয়সের ছেলে মেয়েরা কেমন আছে? চেম্বারে ছেলেকে নিয়ে বাবা এসেছেন -অভিযোগ সামনে  এসএসসি  পরীক্ষা অথচ ছেলে এসময়ে স্কুল বদলাতে চাচ্ছে। কারন হিসেবে জানা গেল তার কয়েকজন বন্ধু অনেক দিন যাবত তাকে টিটকারি, তিরস্কার, অপমান করে যাচ্ছে।তাকে বন্ধুরা " সাপ" ও বেইমান বলে  এবং তাকে দেখলেই সাপের মতন "হিস হিস " শব্দ করতে  থাকে।  ফেইসবুকে তাদের  একটি গ্রুপ চ্যাট আছে,।কিছু দিন আগে সে গ্রুপের প্রোফাইল পিকে একটি সাপের ছবির মাথায় তার ছবি দিয়ে তারা পোস্ট দেয়।
ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম তোমার স্কুল কতৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি? সে বলে তারা আরে ক্ষেপে যাবে এ ভয়ে কাউকে জানায়নি। বাবার কাছে জানতে চাইলাম আপনারা কি করেছেন? তিনি বলেন -আমরা তো কিছু জানতামই না।পরীক্ষার আগে স্কুল পরিবর্তনের গোঁ ধরাতে জানতে পারি।
আমরা পরিবারের সদস্যরা  অনেক পরে জানি আমার সন্তান মাদকাসক্ত,ধর্ষণে লিপ্ত, হত্যা খুনের সাথে জড়িত বা অন্য কোন অনৈতিক, অবৈধ কাজে লিপ্ত অথবা এই ছেলের মতন তারা বিপদগ্রস্ত, ব্লাকমেইলের শিকার বা হেনস্তা লান্চনা শিকার।
প্রতি বছর ১০অক্টোবর পালন করা হয় " বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য "দিবস।এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ঃ "পরিবর্তিত বিশ্বে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য"। অন্তত এ দিবসের প্রতিপাদ্যের কারনে হলেও আমাদের খোঁজ নিতে হবে আমাদের তরুনরা কেমন আছে।জাতিসঙ্গের সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৪-২৮ বছর বয়সী ছেলে মেয়েরা হচ্ছে তরুন।
দিন দিন এ তরুনদের মাঝে বাড়ছে  অধৈর্যতা,স্হিতিহীনতা,সহিংসতা, আত্মহত্যা,মাদকাসক্তি সহ বিভিন্ন মানসিক রোগ।যাদের মানসিক রোগ হয় তাদের  ৫০% এর  ঐ রোগের প্রথম লক্ষণ ১৪ বছরের মধ্যেই দেখা দেয়। আবার লক্ষণ দেখা দেওয়া ও চিকিৎসা নেওয়ার মধ্যে ফারাক থাকে প্রায় ৫ বছর। আমাদের এই অজ্ঞতা ও অসচেতনতা কাটিয়ে উঠতে হবে, কেননা জীবনকে সুন্দর, স্বার্থক,সুখী করতে  হলে শৈশব থেকেই ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে।
কিছু সংখ্যা তথ্য ঃ কৈশোর -তারুণ্যে আত্মহত্যা হচ্ছে মৃত্যুর ২য় সর্বোচ্চ কারন( বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) ;প্রতি ১০ মিনিটে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একজন কিশোরী সহিংসতার কারনে মারা যায়(ইউনাইটেড ন্যাশনস চিলড্রেন ফান্ড) ;৮৩% তরুণ মনে করে বুলিং তাদের আত্মমর্যাদার উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে(ডিসথেলেবল ডট অরগ);ট্রান্স-জেন্ডার তরুনদের ৫১% আত্মহত্যার চিন্তা করে, ৩০% আত্মহত্যার চেষ্টা করে (সেন্টার ফর ট্রান্স ইউথ হেলথ এট চিলড্রেন হসপিটাল,লসএনজেলস) এবং ২০% তরুণ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভুগে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) ।
সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা ঃ(১) সাইবার বুলিংঃউপরে যে স্কুল বদলানোর ছেলের কথা বলকাম এটি তার একটি উদাহরণ। ইমেইলে,টেক্সটে বা অনলাইন পোস্টে বিব্রতকর বা হুমকিজনক ছবি বা তথ্য দেওয়া ;এমন মন্তব্য ও পোস্ট যা ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে বা তাকে আহত করে ;অথবা আক্রমনাত্বক বা বিদ্বেষ মূলক যে কোন আচরণকে - সাইবার বুলিং বলা হয়।২০% জন নারী সাইবার বুলিং এর শিকার হন এবং ৯২% টিন-এজ প্রতিদিন অনলাইনে থাকে (স্টপ বুলিং ডট অরগ)। এরকম বুলিং এর জন্য হাজার হাজার ছেলে মেয়ে শুধু মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছে না,তারা পারিবারিক ও সামাজিক  সমস্যায় পড়ছেন, মানসিক রোগে ভুগছে, পড়াশোনা ক্যারিয়ার নষ্ট হচ্ছে সর্বোপরি অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে। (২) নির্যাতন ঃপরিবার ও অন্যত্র তরুণরা শারীরিক, মানসিক, যৌন ও আবেগীয় নির্যাতনের সম্মুখীন হয়।এছাড়া অবহেলা, বন্চিত হওয়া তো রয়েছেই।
(৩)সহিংসতা ও মাদকাসক্তিঃধর্ষন,হত্যা, ছিনতাই,  প্রভৃতি মারাত্মক অপরাধ মূলক কাজে অনেক তরুণ জড়িয়ে যাচ্ছে। গ্যাং কালচার, ডিসকো পার্টি সহ নানান রকম নিত্য নতুন অপকর্ম, অপসংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ছেন আমাদের সন্তানরা।(৪)আত্মহত্যা ঃপ্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৮ লক্ষ লোক আত্মহত্যা করে, এর মধ্যে তরুনদের মৃত্যুর ২য় সর্বোচ্চ কারন হচ্ছে আত্মহত্যা। ৭৮% আত্মহত্যা ঘটে আমাদের মতন নিন্ম ও মধ্যম আয়ের দেশে। আত্মহত্যার আচরণের মধ্যে রয়েছে -আত্মহত্যার চিন্তা বা পরিকল্পনা, আত্মহত্যার চেষ্টা ও আত্মহত্যা।
যেভাবে বুঝবেন কেউ আত্মহত্যার ঝুকিতে রয়েছেন কিনা ঃমরতে চাওয়া, নিজকে হত্যা করতে চাওয়ার ইচ্ছা পোষন;আশাহীন ও শুন্যতাবোধ,বেচে থাকার যুক্তি নেই মনে করা ;আত্মহত্যার প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ;জীবনের ঘেরাটোপে আটকে গেছি ও এর কোন সমাধান নেই মনোভাব ;অসহ্য যন্ত্রনা ( শারীরিক বা মানসিক) ;অন্যদের বোঝা হয়ে আছি মনে করা ;পরিবার, বন্ধু থেকে নিজকে গুটিয়ে নেওয়া ;ক্রোধ দেখানো, প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা ; আবেগ বা মন- মেজাজের অস্বাভাবিক উঠা- নামা ( তীব্র অশান্তি থেকে হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া বা সুখী হয়ে উঠা।আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেললে অনেক রোগী "রিলিফ " ফিল করে ও সব যন্ত্রণার অবসান হতে যাচ্ছে ভেবে শান্ত হয় এমনকি সুখী ভাব দেখা দেয়)।
মনে রাখতে হবে যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় পরবর্তীতে আত্মহত্যা করার ঝুকি সাধারনের চেয়ে ৫০-১০০ গুন বেশি। আত্মহত্যার কথা বলা ও চেষ্টাকে তাই খাটো করে দেখার উপায় নাই এবং এরা প্রকৃত আত্মহত্যা করবে না এরকম ভাবা সঠিক না।(৪)নিজকে ক্ষত/আহত করা(সেল্ফ হার্ম)--আত্মহত্যার ইচ্ছে নেই তবুও নিজ ইচ্ছায় নিজকে আহত করা কিছু আবেগ তাড়িত তরুন তরুণীদের বদ অভ্যাসে দাড়িয়ে যায়।পরিবার, দাম্পত্য জীবন বা প্রেমের সম্পর্কে সামান্য মানসিক আঘাত পেলে, আকাঙ্খা পূরন না হলে বা ম্যানপুলেট করতে তারা হাত কেটে ফেলে, ঘুমের ঔষধ খায়,ক্ষতিকর কিছু গলাধকরন করে(স্যাভলন),শরীরের অংশ বিশেষ পুড়িয়ে ফেলে ইত্যাদি।
যা করনীয়ঃসামান্য কিছু ভাল কাজই অনেকের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। আমেরিকায় নিউইয়র্কে " মেন্টাল হেলথ এডুকেশন ইন স্কুলস 'ল " নামে একটি আইন পাস করা হয়েছে। এই আইনে নিউইয়র্কের কিন্টারগার্ডেন থেকে দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত সকল স্কুল কলেজে সকল ছাত্র ছাত্রীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য  বিষয়ে শিক্ষা দান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের দেশে ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে স্হান দিতে হবে। শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নানামুখী প্রচার ও প্রোগ্রাম রয়েছে। যেমন হাত ধেয়া,দাত মাজা,ভাল পুষ্টি, ব্যায়াম। একই রকম প্রচার ও প্রোগ্রাম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য থাকবে না কেন?ঢাকা মেডিকেলে ছাত্র ছাত্রীদের "শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য " নিয়ে একটি ক্লাসের পর এক ছাত্রী জিজ্ঞেস করলো "স্যার টিভিতে আপনার সন্তানকে ওরস্যালাইন খাওয়ান বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়।আপনার ক্লাশ শুনে মনে হচ্ছে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে এরকম বিজ্ঞাপন দেওয়া আরো জরুরি "।
উন্নত দেশগুলোতে স্কুল কলেজ থেকেই "সোশাল ইমোশনাল লার্নিং " (এসইএল)  শেখানো হয়।এতে থাকে ঃআত্মসচেতন হওয়ার শিক্ষা ;আত্ম ম্যানেজমেন্ট কৌশল ;সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ;সম্পর্ক দক্ষতা ;দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা। এছাড়া তরুণদের শেখাতে হবে যে কোন চাপ,দুর্যোগ বিপর্যয়ের পর কিভাবে ঘুরে দাড়াতে হয় ও দুরুত স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা যায়।এর মধ্যে রয়েছে  ঃসহযোগিতাপূর্ন ব্যক্তিগত সম্পর্ক ;সমস্যা সমাধানে ভাল দক্ষতা ;কখন,কোথায়, কার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে হবে তা জানা।
সর্বশেষে বলবো তরুণদের সঙ্গে যেন পরিবারের থাকে অকপট, খোলামেলা, সৎ যোগাযোগ,তাদের "ক্ষমতায়িত" করতে হবে যেন নিজ দায়িত্বে "পরিস্থিতি সামাল "দিতে পারে  এবং পরিবারে  যেন একটি " প্রযুক্তি মুক্ত "(টেক ফ্রি) সময় থাকে, যখন পরিবারের সবাই একত্র হয়ে নিজেদের মতন করে সময় কাটাতে পারেন।

প্রফেসর ডা. তাজুল ইসলাম
প্রফেসর অব সাইকিয়াট্রি
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।
ইমেইল ঃdrtazul84@gmail.com
Phone :01715112900 

Saturday, September 29, 2018

সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল

আবেগীয় বুদ্ধিমত্ত্বা(ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স)ঃসফলতার মূল চাবিকাঠি
পর্ব-১ঃ
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।কিন্তু কেন সেরা?  প্রধানত একারনে যে সকল প্রানীর চেয়ে মানুষ বুদ্ধিতে সেরা। মানব সমাজে বুদ্ধিমানদের বেশ কদর রয়েছে। মা-বাবারা তাদের সন্তান যে খুব মেধাবী (বুদ্ধিমান)  সেরকম সার্টিফিকেট জোগাড় করার জন্য হেন " হীন পন্থা " নেই তা অবলম্বন করছে না।জিপিএ -৫ পাওয়ার জন্য নিজেরা কালো মার্কেট থেকে প্রশ্ন পত্র ফাস করে ঐ প্রশ্নের উত্তর জোগাড় করে " প্রিয় মেধাবী (?)" সন্তানদের হাতে পৌঁছে দেন।সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের ও মূল যুক্তি ছিল সব চাকরির মাপকাঠি হবে " মেধা"।
কিন্তু আসলেই কি বুদ্ধিমত্বা সফল জীবনের চাবিকাঠি?
  মনোবিজ্ঞানীরা  বুদ্ধিমত্তা, সফলতা ও সুখী হওয়া নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। বর্তমানে জানা গেছে শুধু মাত্র একাডেমিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সফল হবেনই এর নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।গবেষণায় প্রমানিত যে জীবনে সফলতার মূল চাবিকাঠি হচ্ছে " আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা" বা ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স।
প্রাক-ভাবনাঃ
কিছু ঘটনার উল্লেখ করছি -
(১)এক বালক পিস্তল নিয়ে ছিনতাই করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পরে।পুলিশী জিজ্ঞাসায় সে জানায় স্কুলে তার সঙ্গী সাথীরা তাকে অবজ্ঞা, অবহেলা, অপমান করতো।সেও যে একজন "বীর" এটি প্রমাণ করতে সে এই দুঃসাহসিক কাজ বেছে নেয়।(২) আমেরিকায় ১২ বছরের নীচের শিশুদের গুলিতে যারা মারা যায় তাদের ৫৭% হচ্ছে ঐ শিশুদের আপন মা- বাবা।শিশুদের এরকম উন্মদ আচরণের কারন অতি ছোট খাট ঘটনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো হচ্ছে সন্তানদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।যেমন - মাত্রাতিরিক্ত টিভি, মোবাইল দেখতে না দেওয়া।আমাদের দেশে ও কিছু আহ্লাদে সন্তান তাদের মা-বাবার কাছে নানা অন্যায় আবদার করে থাকে ( মোটরসাইকেল বা নতুন মডেলের গাড়ি কিনে দাও)। বারবার এমন আবদার মেটাতে না পারলে "সোনার ছেলেরা/মেয়েরা" ক্ষিপ্ত হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজ করে থাকে।
(৩) ভার্সিটিতে এক নবাগত ছাত্র তার সিনিয়র "বড় ভাইকে" সালাম দেননি। সিনিয়র ভাই ক্ষুব্ধ হয়ে তার সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে  ঐ " বেয়াদব(?) " ছাত্রকে আদব- কায়দা শেখানোর জন্য  প্রহার করে তার হাত পা ভেঙে হল থেকে বের করে দেয়
উদাহরণের আর ফিরিস্তি বাড়াচ্ছি না। উপরোক্ত আগ্রাসী আচরণ গুলো কেন ঘটলো বা ঘটে? কেন মানুষের মধ্যে হঠাৎ তীব্র আক্রমনাত্বক আচরণ এরকম বেপরোয়া হয়ে উঠে? কেন বুদ্ধিমান মানুষ নিজের অর্বাচীন, অমানবিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না?
আমাদের পরিবার, সমাজে এ ধরনের নৃশংস, আক্রমনাত্বক আচরণ বর্তমানে অহরহ ঘটছে। সমাজে যেন আগ্রাসী আচরণের "সুনামি " চলছে।
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ দিন ধরে মানুষ কেন মাঝে মাঝে এমন "সেন্সলেস আচরণ " করে  তার কারন খোজার চেষ্টা করছেন।
ব্রেইন মেকানিজমঃ
এই যে ক্রোধের "অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ " - এর উপর গবেষণা করতে গিয়ে স্নায়ু বিজ্ঞানীরা ব্রেইনের কিছু রহস্য উন্মোচন করতে পেরেছেন। যখন আমরা চিন্তা করি, অনুভব করি, কল্পনা করি  বা স্বপ্ন দেখি তখন ব্রেইন কোষগুলো কিভাবে অপারেট করে সে বিষয়ে প্রচুর তথ্য জোগাড় হয়েছে। আরো জানা গেছে কিভাবে ব্রেইনের " আবেগীয় কেন্দ্র গুলো " ক্রোধ সৃষ্টি করে বা কান্না সৃষ্টি করে।
আরো জানা সম্ভব হয়েছে ব্রেইনের আবেগের সেই প্রাচীন আবেগীয় কেন্দ্র গুলো কেন আমাদের যুদ্ধে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করে  ভালোবাসার প্রনোদনা জোগায়।
এসব জানার ফলে ব্যক্তিক বা সামস্টিক ভাবে আমাদের যে "ইমোশনাল ক্রাইসিস " সেগুলো কিভাবে মোকাবেলা করা যাবে  সে পথ,পন্থার খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। বিজ্ঞান এখন  মনস্বতাত্তিক এসব " জরুরি ও হতবুদ্ধিকর" প্রশ্ন গুলোর উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছে।
বিজ্ঞানের এই সর্বশেষ তথ্য গুলো বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের " প্রাচীন সংকীর্ণ ধারনাকে" চ্যালেঞ্জ করছে। প্রাচীন ধারণা হচ্ছে বুদ্ধিমত্তা বংশধারার ফল এবং সেজন্য জীবন অভিজ্ঞতা দিয়ে সেটি পরিবর্তন করা সম্ভব না।আরো মনে করা হতো যে এসব "অর্জিত ক্ষমতা বা প্রবনতা" (এপটিচিউড) দ্বারা আমাদের "ভাগ্য " অনেকাংশে পূর্ব নির্ধারিত। এসব কারনপ আমাদের সন্তানদের মধ্যে কিসব পরিবর্তন এনে তাদের জন্য আরো উন্নত জীবন এনে দেওয়া যায়, সেসব নিয়ে তেমন মাথা ঘামানো হতো না।আমরা এ প্রশ্নের ও সঠিক উত্তর জানতাম না কেন একজন "অতি মেধাবী " জীবনে তেমন কিছু করতে পারে না অথচ মোটামুটি বুদ্ধিমত্তার একজন কপন আশ্চর্য্যজনক সফলতা পেয়ে যায়।
বর্তমানে এসবের উত্তর জানা গেছে,  আর তা হচ্ছে -"আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা" বা ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স। আবেগীয় বুদ্ধিমত্তায় থাকে ঃ আত্ম -নিয়ন্ত্রণ (সেল্ফ কন্ট্রোল ; সতেজতা ও উদ্দীপনা ;কোন লক্ষ্য অর্জনে "লেগে থাকার" গুন বা অটল থাকার গুন; এবং নিজকে মটিভেট করার ক্ষমতা।
আশার কথা এসব গুনাবলী বা দক্ষতা আমরা আমাদের সন্তানদের শেখাতে পারি (যেখানে বুদ্ধি হয়তো বাড়ানো সম্ভব নাও হতে পারে) । এভাবে আমরা তাদের জীবনে সফল হওয়ার উন্নততর "সুযোগ " করে দিতে পারি ( তাদের বংশগত বুদ্ধিমত্তা যে পর্যায়েরই হোক না কেন)।
( পর্ব -২ঃআগামীকাল(

Wednesday, September 26, 2018

মানসিক চাপের শহর ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জিপজেট এর তালিকা অনুযায়ী ঢাকা  বিশ্বের সবচেয়ে মানসিক চাপের শহর।এতে খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা মানসিক চাপ সৃষ্টির অসংখ্য উপাদান ঢাকা শহরে বিদ্যমান।

ঢাকা শহর একটি মেগা সিটি। বিশ্ব ব্যাংক এর তথ্য অনুযায়ী এর জনসংখ্যা ১ কোটি ৮০ লক্ষ, যা ২০৩৫ সনে দ্বিগুণ হয়ে সাড়ে তিন কোটিতে দাড়াবে। এতো ঘনবসতি পূর্ণ শহরে নাগরিকের জরুরি প্রয়োজন মেটানো চারটি খানি কথা নয়

।দিনে দিনে নিত্য ব্যবহার্য পন্যের মূল্য বাড়ছে, গ্যাস, বিদ্যুত,পানির যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি এসবের দামও দিন দিন বাড়ছে। ফলে সাধারন মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ বিশ্বে দুরুত ধনী হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় এক নম্বরে স্হান করে নিয়েছে। তার মানে প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ চলে যাচ্ছে গুটিকয়েক ধনী ব্যক্তিদের হাতে, গরীব আরো গরীব হচ্ছে।

এই আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য ঢাকা শহরে নগ্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে,যা মানসিক চাপের অন্যতম কারন।

এছাড়া ঢাকার শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, ট্রাফিক জ্যাম, জলাবদ্ধতা, মশা ও মশাবাহিত রোগ,গন পরিবহনের অপ্রতুলতা, ধোঁয়া, ধুলো, ডাস্টবিনের উপচে পরা ময়লা, ভেজাল খাবার, হাটার,বিনোদনের জায়গার অভাব - ইত্যাদি অসংখ্য আর্থ -সামাজিক ও অবকাঠামো গত সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।

এসবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মানসিক চাপের পরিমাণ অপরিমেয়।

ঢাকা বর্তমানে আক্ষরিক অর্থেই একটি "অচল" শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। ১০ বছর আগে ও ঢাকায় যানবাহনের গতি ছিল ঘন্টায় ২১ কিলোমিটার, যা বর্তমানে প্রায় ৫ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। ২০২৫ সনে এ গতি ঘন্টায় ৪ কিলোমিটারে নেমে আসবে।

তারমানে যানবাহনের চেয়ে পায়ে হেটে গন্তব্য স্হানে আগে পৌছানো যাবে।
যানজটের কারনে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ( বিশ্ব ব্যাংক) ।

এর সঙ্গে আমাদের মন- মেজাজ হয়ে পড়ছে  খিটখিটে, অস্হির ও অধৈর্য প্রকৃতির। ফলে পরিবার ও সমাজে উত্তেজনা, উগ্রতা ও আবেগ তাড়িত আচরণের হার বেড়ে যাচ্ছে।

এছাড়া খুন,ধর্ষণ, অপহরণ ও মাদকাসক্তি  ক্রমশ বেড়েই চলছে। থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন এর সমীক্ষা অনুযায়ী যৌন সহিংসতার দিক থেকে ঢাকার অবস্থান ৪র্থ স্হানে।

অন্য দিকে এসব অনাচার, অবিচার, অপরাধের কোন সুরাহা নাগরিকরা পাচ্ছে না।আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন, বিচারালয় কোথাও তেমন প্রতিকার পাবে তেমন বিশ্বাস নাগরিকদের মধ্যে নাই। তাই ডিপ্রেশন, অবসাদ,হতাশা বাড়ছে।

আমাদের ব্রেইনে রয়েছে একটি "স্বয়ংক্রিয় নার্ভাস সিস্টেম " (অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম) । এটি আবার দুভাগে বিভক্ত।

একটি হচ্ছে " প্যারাসিমপ্যাথেটিক- যা আমাদের শরীর - মনকে শান্ত, স্হির রাখতে সাহায্য করে।

অন্যটি হচ্ছে " সিমপ্যাথেটিক" বিভাগ - যা আমাদেরকে "উত্তেজিত করে, ইমারজেন্সি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে।এর জন্য প্রচুর শক্তি সামর্থ্য একত্রে জড়ো করতে হয়।

মানসিক চাপ আমাদের সিমপ্যাথেটিক সিস্টেমকে সব সময় সক্রিয়, সজাগ ও উত্তেজিত করে রাখে।

এর ফলে  উদ্বেগ,উৎকন্ঠা,বিরক্তি, রাগ, ক্রোধ, আগ্রাসী আচরণ যেমন দেখা দিতে পারে তেমনি পরবর্তীতে ডিপ্রেশন বা অবসাদ, হতাশা, হালছেড়ে দেওয়া নিশ্চেষ্ট, অকেজো মানুষ হয়ে দাড়াতে পারে।

সর্বোপরি চাপ যখন দীর্ঘ স্হায়ী হয় তখন শরীর অনবরত শক্তি জড়ো করতে থাকে ও সে শক্তি অহেতুক ক্ষয় হতে থাকে। এভাবে ক্রমাগত শক্তি ক্ষয়ের ফলে শরীরের বিভিন্ন তন্ত্রের গঠন কাঠামোতেও পরিবর্তন সাধিত হয়

।মানসিক চাপ/ পীড়ন এভাবে বিভিন্ন শারীরিক রোগ ও তৈরি করে থাকে। যাকে আমরা " সাইকো- সোমাটিক" ডিসঅর্ডার বলি।

আমাদেরও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, স্বস্তি যোগ্য, নিরাপদ ও নান্দনিক ঢাকা শহর  গড়ে তোলার জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ স্হায়ী কর্মপরিকল্পনা এখনই হাতে নিতে হবে।সময় নষ্ট করার মতন সময় আমাদের নেই।

তানাহলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

সাম্প্রতিক কোঠা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন  ছিল এই আর্থসামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা, বৈষম্য ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এক  প্রতিবাদ

। যে কোন চাপ,ক্ষোভ ক্রমাগত বাড়তে থাকলে এক সময় এটি বিস্ফোরিত হয় নানা চ্যানেলের মাধ্যমে। চাপের শহর ঢাকা  বিস্ফোরিত হয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার আগেই আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রফেসর ডা. মো. তাজুল ইসলাম
প্রফেসর অব সাইকিয়াট্রি
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা
ইমেইল ঃdrtazul84@gmail.com