Sunday, October 21, 2018

রোগ কাহিনী -৩৫ঃ শালি-দুলাভাই মাখামাখি বনাম স্বামীর হ্রদয়ে রক্তক্ষরণ

কাহিনী সংক্ষেপঃ
আমিন সাহেব, বয়স ৪০। ১৩ বছর হলো বিবাহিত জীবন। ১ছেলেও ১ মেয়ের জনক।

বিয়ের পর থেকেই তিনি লক্ষ করেন তার স্ত্রী তার বড় দুলাভাইয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত মাখামাখি করে থাকে।
যেমন -
গলা জড়িয়ে বসে থাকে,
নিজ হাত দুলাভাইকে সযত্নে খাইয়ে দেয়
, এক সাথে বিছানায় শুয়ে থাকে
,দুলাভাইয়ের পায়ের উপর পা দিয়ে বসে খেতো,

দুলাভাইয়ের গালে ঠোকনা দেয়,শরীরে চিমটি কাটে ইত্যাদি।
এসব তার মোটেই পছন্দ নয়।
সে স্ত্রীকে এভাবে "পর পুরুষের" সঙ্গে ঘেষাঘেষি না করতে নিষেধ করেন।

কিন্তু স্ত্রী তার কথা মানে না।
তাকে গুরুত্ব দেয় না,তার তেমন যত্ন নেয় না বরং তার সামনেই দুলাভাইয়ের সঙ্গে নষ্টামি করে থাকে।

এ নিয়ে তিনি শ্বশুরকে বলেন কিন্তু তিনি উল্টো তাকে শাসায়।বলে  তুমি কয় টাকা উপার্জন করো যে আমার বড় জামাইয়ের বিরুদ্ধে বলছো( তখন তিনি বেকার ছিল না) এমন ভালো জামাইয়ের বদনাম করছো।

তারা উনাকে বেয়াদব বলেন।

উনি আরো জানতে পারেন যে তার ছোট শালির সঙ্গে ঐ দুলাভাইয়ের শারীরিক সম্পর্ক ও ছিল যা নাকি তার স্ত্রীর সামনেই একজন তাকে বলে

।এতে তিনি আরো জোর দিয়ে স্ত্রীকে ঐ লোকের সঙ্গে মিশতে মানা করেন। তবে তার স্ত্রী তাতে মোটেই কর্নপাত করেনি।

তার ফ্যামিলি ও এগুলো জেনে যায়।তারা ও ঐ লোকের সঙ্গে মিশতে মানা করেন। তাতে ও কোন কাজ হয়নি।

তিনি চাকরি পাওয়ার পর তার স্ত্রীকে আর শ্বশুর বাড়িতে যেতে দেননি। গত ৮ বছর যাবত তার স্ত্রীকে তার বাপের বাড়িতে যেতে দিচ্ছে না।

শ্বশুড় বাড়ীর লোকদের বলে দিয়েছি আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসে থাকি মেয়েকে দেখতে চাইলে ঐ সময় আসবেন, আমার সাথে যাতে দেখা না হয়।

তার ভাষ্য শ্বশুর বাড়ির কাউকে দেখলে বিশেষ করে শ্বাশুড়িকে দেখলে মনে হয় এদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলি।

সে বলে সে সময় এমন কষ্ট লাগতো মনে হয় সন্তান মারা গেলে ও এমন কষ্ট হতো না।

অথচ এতো দিন পর ও তার মনে ঐ অতীত স্মৃতি বারবার মনে আসে।

বিশেষ করে যখন কোন পুরুষকে দেখে অন্য নারীদের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করছে তখন ঐ ব্যাটার(দুলাভাইয়ের) লুচ্চামির কথা  মনে পরে যায়।

আবার যখন কোন নারীকে দেখি তার স্বামীকে আদর,ভালোবাসা দিয়ে সুখী সংসার করছে তখন ও মনে ক্ষেদ জমে, আমি এমন হতভাগা কেন ছিলাম, আমার জীবনে এমন বউ কেন পেলাম না।

এতো দিন পর কেন এসেছেন জিজ্ঞেস করলে বলেন, স্যার এখন আর সহ্য হচ্ছে না।

আগে কষ্ট হতো তবে এখন ঐ কষ্ট নিতে পারি না

।একেকবার মনে হয় সন্তানদের মেরে নিজে আত্মহত্যা করি।

এখন কি সমস্যা জিজ্ঞেস করলে বলে

- যখনই ঐ কথা গুলো মনে পরে
মাথায় চাপ লাগে,
ঝিম ধরে বসে থাকি,
শরীরে ব্যালান্স থাকে না,,
রাগ উঠে
,সামান্য কারনে স্ত্রীর উপর ক্ষেপে যাই,
মনে হয় আত্মহত্যা করি,
অনবরত সিগারেট খেতে থাকি,
অন্যমনস্ক হয়ে যাই যার জন্য মোটর সাইকেল চালানো বন্ধ করে দিয়েছি এক্সিডেন্ট এর ভয়ে।

অবসেশন কিনা বোঝার জন্য জিজ্ঞেস করলাম এ চিন্তা গুলোকে ভুল মনে করেন কিনা।

উত্তরে বলে না।এগুলো আমার নিজ চোখে দেখা জিনিস কিভাবে ভুল মনে করবো।

স্ত্রী কি বলে জানতে চাইলে বলেন,সে এটিকে গুরুত্ব দেয় না এমনকি নিজের অতীতের জন্য দুঃখ প্রকাশ ও করে না।

তার আকুতি
স্যার স্বপ্নেও দেখি তাদের কুকর্ম,
কিছুতেই ভুলতে পারছি না,
মনে হয় সন্তানদের মেরে নিজে আত্মহত্যা করি।

এই কেইস হিস্ট্রি থেকে কি শিখলাম?

১।আমাদের দেশে অভিভাবকরা মেয়েকে কোন তরুণ যুবকের সঙ্গে মিশতে দেন না এই ভয়ে না জানি কি কুকর্ম করে বসে।

কিন্তু শালি দুলাভাই সম্পর্ককে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হয় যেন সব দুলাভাইরা ফেরেশতা।

২। ক্ষমতা, অর্থের আধিপত্য সবখানেই। এমনকি মেয়ের জামাইদের মধ্যে ও এই বৈষম্য করা হয়।

৩। অভিভাবক যদি  কোন পুরুষের  সঙ্গে মাখামাখিকে "নিরাপদ " মনে করে লাইসেন্স দিয়ে দেয় তাহলে তার সুযোগ ঐ চরিত্রবান পুরুষ নিতে কার্পণ্য করবে না।

আমি এমন কেইসও জানি দুলাভাই দ্বারা প্রেগন্যান্ট ও হয়ে গেছে। অবাক হবার বিষয় মা বাবা সেগুলোকে "তেমন কিছু না" বলে হাল্কা করে দেখে।
অনেক সময় মেয়েকে উল্টো শাসায় কেন মুরুব্বি দুলাভাইয়ের নামে বদনাম করছে।

৪। মূল কথাঃ
কোন কষ্টদায়ক তিক্ত অভিজ্ঞতা বা ভয়াবহ স্মৃতি মানুষের মস্তিষ্কে বড় ধরনের "আঘাত" সৃষ্টি করে ( মেন্টাল ট্রমা)।

কারো কারো ক্ষেত্রে সে ট্রমা সারাজীবন তাকে ক্ষত বিক্ষত করে থাকে। সেই দুঃসহ স্মৃতি তার জীবনকে তচনচ করে দেয়।

৫। বিশেষ ঘটনা, যা ঐ স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে পারে, ট্রিগার হিসেবে কাজ করে ও ঐ কষ্টদায়ক ঘটনা "জীবন্ত " হয়ে তার মানস জগতে টর্নেডোর মতন আঘাত করে।
সে স্মৃতি এমনকি স্বপ্নের ভিতর ও বারবার হানা দিতে  পারে।

৬। দাম্পত্য জীবনে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে এমন " কাটা" রেখে কখনো  কেউ সুখী হতে পারে না

।তাদের উভয়েরই উচিত ছিল এ "ক্ষত" নিরাময়ে প্রফেশনাল সাহায্য নেওয়া।
দেরীতে হলেও উনি আমার কাছে এসেছেন, তাই সাধুবাদ জানাই।

কিন্তু যারা প্রতিদিন কোন কষ্ট নিয়ে দিনাতিপাত করছেন তাদের এই কষ্ট বহন করে চললে এক সময় আত্মহত্যা বা অন্যকে হত্যার ঝুঁকি থাকে।

আমরা কি সাবধান হবো না?

Saturday, October 13, 2018

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা-৩ঃআবেগীয় মস্তিষ্ক

এক দম্পতির ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে ছিল "সেরিব্রাল পালসির" রোগী। এ ধরনের রোগী একদলা মাংস ছাড়া আর কিছু না।মানসিক প্রতিবন্ধীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে এ রোগ।হুইল চেয়ারে ঐ মেয়েকে নিয়ে তারা ট্রেনে করে যাচ্ছিল।হঠাৎ ট্রেনটি দুর্ঘটনায় ব্রীজ ভেঙ্গে নদীতে পরে যায়।যখন কামরায় পানি দ্রুত বেগে ঢুকতে লাগলো তখন ঐ মা বাবা জানালা দিয়ে কোন রকমে ধাক্কা মেরে ঐ প্রতিবন্ধি মেয়েকে উদ্ধার কর্মীদের কাছে ফেলে দেয়।এর পর পরই তারা দুজন ডুবে মারা যান।
যে সন্তানের কোন ভবিষ্যত নেই, তারা না থাকলে যার বেচে থেকে ও লাভ নেই, তবুও মা বাবা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে ঐ প্রতিবন্ধী মেয়ের জীবন রক্ষার জন্য।

বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীদের মতে সন্তানদের প্রতি মা বাবার এরকম চরম আত্ম ত্যাগের পিছনে রয়েছে " প্রজনন সফলতার "(reproductive success)  তাগিদ। অর্থাৎ এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে বংশধারার " জিন" সন্চালিত করে দেওয়ার তাগিদ।

কিন্তু আসলেই কি এটি নিছক তেমন স্বার্থপরতা?

মূলত ক্রাইসিস মুহূর্তে মা বাবার এ এরকম  আত্মত্যাগ "নিখাদ ভালোবাসা " ছাড়া আর কিছু নয়।
এটি হচ্ছে "পরহিতের জন্য ভালোবাসা " (এলট্রুস্টিক লাভ)।

এতে প্রমানিত হয় আমাদের গভীরতম অনুভূতি, অনুরাগ ও আকাঙ্খাগুলো হচ্ছে আমাদের জীবনের অত্যাবশ্যকীয় গাইড।মানব অস্তিত্ব টিকে থাকার পিছনে এসবের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

এই ক্ষমতা অতুলনীয়। একমাত্র নিখাদ ভালবাসা  ছিল ঐ সন্তানকে রক্ষা করার আন্তরিক তাগিদ,যা নিজেদের রক্ষা করার তাড়নাকে দমিয়ে রেখেছে।
নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে দেখলে এই আত্মত্যাগ ছিল অযৌক্তিক( ইররেশনাল)। কিন্তু অন্তর দিয়ে দেখলে এটি ছিল একমাত্র "চয়েজ" যা তারা নিতে পারতো।

যখন তীব্র আবেগ যুক্তিকে হারিয়ে দেয়ঃ

"মানুষ সঠিক ভাবে দেখতে পারে (শুধু)  হ্রদয় দিয়ে (চক্ষু দিয়ে নয়)। যা কিছু অত্যাবশ্যকীয় তা তা চর্ম চোখে অদৃশ্য থাকে "- antoine De Saint Exuoprey

আমাদের বিবর্তনের আবেগীয় ইতিহাস হচ্ছে " ভয়"। এই ভয়ের কারনে আমরা পরিবারকে ও নিজকে বিপদ থেকে রক্ষার জন্য শক্তি সামর্থ্য জড়ো করি।
বিপদের সময় তাৎক্ষণিক ভাবে স্বতস্ফূর্তভাবে সাড়া দেওয়ার প্রবনতা, আমাদের স্নায়ু সিস্টেমে গ্রোথিত রয়েছে।

আদিমকালে মানব পূর্ব পুরুষরা এমন ক্রান্তিকাল কাটিয়েছে, যখন তারা শুধু "অস্তিত্ব ও মৃত্যুর " পার্থক্য বুঝতো।
একই সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে ভাবতো যারা তাদের বংশধারা অব্যাহত রাখবে।
এসব কারনে যখন নিজের বা পরিবারের কারো অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হতো, তারা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া করতো নিজেদের রক্ষা করার জন্য।

এই আদিম প্রবৃত্তি এখনো আমাদের স্বভাবে দৃড়মূল হয়ে রয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে সমাজ সভ্যতার এতো অগ্রগতি হয়েছে যে পুরনো বিবর্তনের গতি তাকে ধরতে পারছে না।

আমরা বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে যতো অগ্রসর হচ্ছি সাংস্কৃতিক, মানবিক দিক থেকে তত অগ্রগতি হয়নি।
কিছু কিছু সামাজিক নিরোধমূলক নৈতিকতা সমাজ গ্রহণ করেছে বটে, তবে তা আমাদের মূল প্রবৃত্তি দমনে তেমন কার্যকর নয়।

আমরা এখনো আবেগীয় প্রতিক্রিয়া করি হাজার হাজার বছর আগেকার প্রকৃতি অনুযায়ী, আধুনিক সভ্যতায় যেমন  হওয়া উচিত ছিল তেমনভাবে নয়।

মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড তার " Civilization and It's discontents" -বইতে উল্লেখ করেন,

সমাজকে বাহির থেকে "রীতি -আইন - কানুন" প্রয়োগ করতে হয়েছে যাতে মানুষ তার অতিরিক্ত "আবেগের ঢেউকে" সামলে রাখতে পারে।

এইরকম "সামাজিক নিরোধ" ব্যবস্থা থাকা সত্বেও প্রায়ই যুক্তির চেয়ে তীব্র আবেগ /প্রেষনা আমাদের প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করে থাকে।
মানুষ কেন এরকম প্রকৃতির হলো?

এর কারন হচ্ছে  মানুষের "মানসিক জগতের আর্কিটেকচার বা স্থাপত্য নকশা"।

এগুলো হচ্ছে আমাদের আবেগের "বেসিক নিউরাল সার্কিট্রি"।

আমরা জন্ম গ্রহণ করি সেই সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে, যেগুলো  ৫০ হাজার প্রজন্মের আগে মানুষের জন্য সর্বোত্তম ছিল। তখন পশুর সঙ্গে পাশবিক আচরণ করেই মানুষকে টিকে থাকতে হতো।

অথচ আমরা ভাবি আমরা জন্ম গ্রহণ করি গত কয়েক প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য নিয়ে।

মানুষের আবেগীয়,সাংস্কৃতিক ও মানবিক বিবর্তন এর হার হচ্ছে খুবই  শ্লথ গতিতে,কিন্ত   আমাদের বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশ হচ্ছে তার চেয়ে সহস্র গুন বেশি হারে।
গত ১০ হাজার বছরে মানব সভ্যতার দুরুত অগ্রগতি হয়েছে এবং জনসংখ্যা ও বিপুল হারে বেড়েছে ( ৫০ লক্ষ থেকে ৭০০ কোটি) ।

কিন্তু এসব অগ্রগতির খুব কমই " দাগ" পড়েছে আমাদের জৈবিক কাঠামোতে ও আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে।

তাই বিস্মিত হওয়ার কারন নেই এটা ভেবে যে, মানুষ এখনো কেন এতো নিষ্ঠুর, নির্মম,অমানবিক ও পাশবিক আচরণ করে।

আমরা বিবর্তিত হচ্ছি খুবই ধীর গতিতে,যে গতি বাড়াতে পারতো সমাজ,রাস্ট্রের নির্ধারকেরা।

মানবিক, সংস্কৃতিবান,হ্রদয়বান ও সৃজনশীল মানুষ যদি সমাজ, প্রশাসনের সর্বস্তরে ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকতে পারতো, তাহলে এই "মানবিক বিবর্তন " আরো জোরদার গতিতে হতে পারতো।

কবে পাবো সে সমাজ,
কবে তৈরি  হবে সে মানবিক জৈবিক কাঠামো?
(পর্ব-৪ঃআসছে)

Sunday, October 7, 2018

রোগ কাহিনী -৩৪ঃস্যার বাংলাদেশের বড় বড় ডাক্তাররা বলে তোমার কোন রোগ নাই, সিঙ্গাপুরের ডাক্তার দেরি না করে বলে তোমার মানসিক রোগ-সর্বাঙ্গে ব্যথা-অষুধ দেবো কোথা

কাহিনী সংক্ষেপঃ
আজাদ সাহেব, বয়স ৪৬ বছর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।১০ বছর যাবত তিনি এই রোগে ভুগছেন।

বিয়ের আগ থেকেই উনার সমস্যা দেখা দেয় যে উনি একা ঘরে ঘুমাতে ভয় পেতেন এবং এর জন্য সব সময় সঙ্গে লোক নিয়ে ঘুমাতে হতো।
তার এই ভয় এখনো আছে।বউ ছাড়া একা ঘুমাতে পারেন না।

এর কিছু দিন পর তিনি শরীরে চিন চিন ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন,ক্রমশ যা অসহ্য যন্ত্রনায় রূপ লাভ করে।

পুরো শরীরই যন্ত্রনা করতো। তবে বেশি হতো হাতে। দিনে মোটামোটি থাকতো, এমনকি ঘুমাতে যেতো ভালই। কিন্তু মাঝ রাতে বা শেষ রাতে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে জেগে যেতো।

এরপর আর ঘুম আসতো না।বউকে বলতো শরীর টিপে দিতে। বউ সারা রাত হাত পা শরীর টিপতে থাকতো। সকাল ৯-১০ টার দিকে ক্লান্ত হয়ে সে ঘুমিয়ে পরতো।

তিনি আরো জানান শরীরে শক্তি পাই না,ভারী কিছু হাত দিয়ে উঠালেও হাতে টের পাই না,মাংসপেশিতে চাপ লাগে না।
টেনশন করলে যন্ত্রনা বাড়ে তবে কাজ করলে ভাল থাকি। ঘুম হয় না,অস্হির লাগে।

একসময় ব্যথা তীব্রতর হয়।সীমাহীন যন্ত্রনা।

দেশের বিখ্যাত সব মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, নিউরো বিশেষজ্ঞ, হাড়-বাত বিশেষজ্ঞ গনকে দেখানো হয়।এ হেন টেস্ট নাই করা হয় নাই।

কিন্তু বড় বড় ডাক্তাররা বলে রিপোর্ট ভাল, আমার কোন রোগ নাই।

এরপর আত্মীয়দের পরামর্শে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান। সেখানকার ডা. তাকে দেখে বলেন,আপনার ঐ ধরনের মারাত্মক কোন রোগ হয়নি। তেমন হলে এতো দিনে মারা যেতেন,সিঙ্গাপুরে আর আসতে পারতেন না

আপনার এটি মানসিক রোগ।

তিনি মাত্র একটি ঔষধ লিখে দেন( পারক্সেটিন- যা একটি এন্টিডিপ্রেসেন্ট)।

এই একটি ট্যাবলেট খেয়েই তিনি ২-৩ বছর ভাল ছিলেন।
কিন্তু এখন আবার ও সে যন্ত্রনা ফিরে এসেছে।

তবে টাকার অভাবে সিঙ্গাপুর যেতে পারছেন না এবং ঐ আগের ঔষধে তেমন কাজ করছে না।

আমাকে বললো, স্যার আপনার অনেক সুনাম শুনে এসেছি, আপনি নাকি ভাল কাউন্সিলিং করেন।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম ঐ যন্ত্রনার সময়ে আপনার মন কেমন থাকতো? 

তিনি বলেন -অস্থির, অশান্তি লাগতো।বউ বলে খিটখিটে মেজাজ হয়ে যেতো।
মনে আনন্দ, ফুর্তি থাকতো না;
কাজে আগ্রহ পেতো না,
ঘুম হতো না;
কোন কিছু নিয়ে ভাবলে ব্যথা শুরু হতো ও বেশি হতো ;
(যেমন-কেউ খারাপ ব্যবহার করলে, কেউ খামোখা ঝগড়া বাধালে,বউ বাচ্চাদের বকা দিলে বা সংসারের কাজে অবহেলা করলে) ।

বউ বলে-
সে দায়িত্বের প্রতি সিরিয়াস ;
নিয়ম কানুন না মানলে ক্ষেপে যায়;
বাচ্চাদের ধমক দিতে দেয় না,
সময় মতন কাজ না করলে রেগে যায়
এবং বাচ্চাদের ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাবে বলে উদ্বিগ্ন থাকে।
তবে একটি ব্যতিক্রমী লক্ষণ তিনি উল্লেখ করেন যে, ঐ যন্ত্রনার সময়ে ও ওনার যৌন চাহিদা বেশি থাকে, যা তার বউও স্বীকার করে।

কেইস হিস্ট্রি থেকে কি শিখলাম?

১। মানসিক রোগ মানে তথাকথিত পাগলামি নয়।সবদিক থেকে স্বাভাবিক মানুষ ও মানসিক রোগী হতে পারে। মানসিক রোগীদের মাত্র ১% সাইকোসিস বাকি ৯৯% হচ্ছে এরকম স্বাভাবিক মানুষ।

২। ব্যথা - মানসিক রোগের একটি অন্যতম  লক্ষণ।

অনেক মানসিক রোগে শারীরিক ব্যথা /যন্ত্রনা থাকতে পারে। বিশেষ করে ডিপ্রেশন, সোমাটোফরম পেইন ডিজঅর্ডার এ এরকম দীর্ঘ স্হায়ী ব্যথা থাকে

৩। কেউ শারীরিক সমস্যা / লক্ষণ নিয়ে দিনের পর দিন ভুগছে,
অনেক ডাক্তার দেখাচ্ছে, কিন্তু তেমন ভাল ফল পাচ্ছে না,
যাবতীয় দামী দামী টেস্ট করেও ডাক্তার বলছে রিপোর্ট ভাল, কোন রোগ নাই---

এমন ক্ষেত্রে নিজেই বুঝে নিবেেন এটি একটি মানসিক রোগ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

৪। ৩ এর মতন রোগীদের কোন রোগ নাই বললে যেমন অন্যায় হবে, তেমনি এটি রোগকে জটিল করে তুলবে ও রোগীকে আত্মীয়দের কাছে তাকেছোট করা হবে।

মানুষ যে লক্ষণ নিয়েই আসুক,সেটি তার সমস্যা ও রোগ।
সেটি শারীরিক রোগ না বলে,টেস্ট ভাল বলে, এটি কোন রোগ নয় বলা অন্যায়।
ডাক্তাররা এমন ভুল করলে রোগীদের যন্ত্রনা শুধু দীর্ঘ স্হায়ী হয় তা না,বিদেশে আমাদের ডাক্তারদের বদনাম ও হয়।একারনে কিছু রোগীর কাছে আমরা আস্হা হারাই।

৫। ঐ রোগীর "অবসেশনাল" ব্যক্তিত্বের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে
(অতিরিক্ত দায়িত্বশীল,নিয়ম কানুনে অনড়,অনিয়ম দেখলে ক্ষিপ্ত হওয়া)।

অবসেশনাল ব্যক্তিদের " পারফেক্ট " হওয়ার প্রবনতা থাকে এবং এদের মধ্যে ডিপ্রেশন হওয়ার ও দীর্ঘ স্হায়ী আবেগ -আচরণ গত সমস্যা ( সাইকোজেনিক পেইন) ঝুঁকি বেশি থাকে।

৬। উনি ডিপ্রেশন এর রোগী। পুরো শরীরে ব্যথা বলে ডাক্তাররা এই রোগের চিন্তা মাথায় আনেনি। অথচ ডিপ্রেশনে বিভিন্ন রকমের শারীরিক লক্ষণ থাকতে পারে,বিশেষ করে বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা এর অন্যতম একটি লক্ষণ
৭। ডাক্তাররা  ও সমাজ শারীরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়,মানসিক সমস্যাকে নয়।একারনে রোগীদের মধ্যে মানসিক যন্ত্রনা শারীরিক লক্ষণ হয়ে প্রকাশ পায়।একে বলা হয় " সোমাটাইজেশন"। আমাদের মতন উন্নয়নশীল দেশে তাই বেশির ভাগ মানসিক রোগী শারীরিক সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে হাজির হন।

Friday, October 5, 2018

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাঃপর্ব-২

বর্তমানে আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেটি খুবই গতিশীল, যেখানে স্বার্থপরতা,সহিংসতা, আত্মার দারিদ্র্যতা সমাজ জীবনের যেটুকু ভালো ছিল তাও অবলুপ্ত করে দিচ্ছে। এ কারনে আমাদের সেন্টিমেন্ট, চরিত্র ও সহজাত নৈতিক প্রবৃত্তি গুলো ক্ষয় প্রাপ্ত হচ্ছে।

মানব জীবনের  নৈতিক গুনাবলি গুলো আসে এর পিছনের আবেগীয় ক্ষমতা থেকে।

যারা আবেগ তাড়নার স্রোতে ভেসে যান,সহজে আবেগ তাড়িত হন,যারা আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম - তাদের রয়েছে "নৈতিকতার ঘাটতি "।

এই আবেগ তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হচ্ছে ইচ্ছা শক্তি এবং এটি চরিত্রের মূল ভিত্তি।

একই ভাবে " পরহিতব্রততা"(এলট্রুয়িজম) এর মূল উৎস হচ্ছে " সমব্যথী "(এমপ্যাথি) হওয়ার ক্ষমতা বা অন্যর আবেগ অনুভূতি সঠিক ভাবে পাঠ করতে পারা ও তাদের অবস্থান থেকে তাদের কষ্টকে অনুভব করা।

যদি আমরা অন্যের চাহিদা প্রয়োজন কি তা বুঝতে না পারি, তাদের হতাশা,নৈরাশ্যের কারন বুঝতে না পারি, তাহলে কিভাবে আমরা তাদের যত্ন নেবো,দায়িত্ব নেবো?

আমাদের বর্তমান এই অস্হির , জটিল ও স্বার্থ -কেন্দ্রীক সমাজে দুটি নৈতিক গুন থাকা সময়ের দাবি। সেগুলো হচ্ছে ঃ
১। আত্ম-দমন/আত্ম সংবরন এবং ২।  দয়া,মায়া,করুনা,সমবেদনা ( কমপ্যাশন)

গবেষণায় দেখা গেছে  বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা আগের যেকোন সময়ের তুলনায় অধিকতর দুর্দশাগ্রস্ত;
তারা অধিক বিচ্ছিন্ন, একাকী;
অধিক হতাশ, বিষন্ন,;
অধিক ক্রোধান্বিত, উচ্ছৃঙ্খল, অবাধ্য ও দুর্দান্ত;
অধিক নার্ভাস /উদ্বিগ্ন 
এবং আবেগ তাড়িত ও আগ্রাসী হওয়ার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ন।

তাহলে এর সমাধান কি?

সমাধান নির্ভর করে এদেরকে তরুণ বয়সে আমরা কিভাবে প্রস্তুত করি তার উপর।

বর্তমানে আমরা শিশুদের আবেগীয় শিক্ষা ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু এর সমাধান হবে স্কুলে সকল শিশুকে কিভাবে হ্রদয় ও আত্মাকে ( হার্ট এন্ড সৌল) একত্র করা যায় সে নিয়ে শিক্ষা দিলে।

এরিস্টটলের দার্শনিক জিজ্ঞাসা ছিল সদগুন(ভার্চু),চরিত্র ও ভালত্ব  নিয়ে।

তার চ্যালেঞ্জ ছিল বুদ্ধি দিয়ে আমাদের আবেগীয় জীবনকে ম্যানেজ করা।
আমাদের তীব্র অনুভূতি, প্রবল অনুরাগ(প্যাশন) যদি যথেষ্ট পরিশীলিত,অনুশীলন/চর্চা করা হয়, তখন সেটি প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত হয়।

এই প্রজ্ঞা আমাদের চিন্তাকে,মূল্যবোধকে ও আমাদের অস্তিত্বকে গাইড করে।
তবে এগুলো সহজে ভেস্তে যেতে পারে এবং এই ভেস্তে যাওয়া যখন তখন হতে পারে।

এরিস্টটলের মতে  সমস্যা আবেগের মধ্যে নয়,বরং আবেগের "যথার্থতা/যথোচিত হওয়া " এবং আবেগ প্রকাশের ধরনের উপর নির্ভর করে

।প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে আমরা "বুদ্ধিকে" আবেগের কাছে আনতে পারি, 
কিভাবে "ভদ্রতা" (সিভিলিটি) কে জন পথে
ও কেয়ারিং কে সমাজ জীবনে আনতে পারি।

যথোচিত আবেগ বলতে কি বোঝায়?

এরিস্টটলের সে বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করুন ঃ

" যে কেউ রেগে যেতে পারে -(এবং)  এটি সহজ।

কিন্ত সঠিক মানুষের সঙ্গে,
সঠিক মাত্রায়,
সঠিক সময়ে,
সঠিক উদ্দেশ্যে
এবং সঠিক পদ্ধতিতে রাগা-
(মোটেই)  সহজ কাজ নয় "।

(৩য় পর্ব-আসছে)

Tuesday, October 2, 2018

তরুনদের মানসিক স্বাস্থ্য

কেমন আছেন আমাদের তরুনরা?
প্রশ্নটি রাস্ট্র, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার সবার প্রতি। অন্তত পরিবার কি খোঁজ নেয় তাদের যুবা বয়সের ছেলে মেয়েরা কেমন আছে? চেম্বারে ছেলেকে নিয়ে বাবা এসেছেন -অভিযোগ সামনে  এসএসসি  পরীক্ষা অথচ ছেলে এসময়ে স্কুল বদলাতে চাচ্ছে। কারন হিসেবে জানা গেল তার কয়েকজন বন্ধু অনেক দিন যাবত তাকে টিটকারি, তিরস্কার, অপমান করে যাচ্ছে।তাকে বন্ধুরা " সাপ" ও বেইমান বলে  এবং তাকে দেখলেই সাপের মতন "হিস হিস " শব্দ করতে  থাকে।  ফেইসবুকে তাদের  একটি গ্রুপ চ্যাট আছে,।কিছু দিন আগে সে গ্রুপের প্রোফাইল পিকে একটি সাপের ছবির মাথায় তার ছবি দিয়ে তারা পোস্ট দেয়।
ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম তোমার স্কুল কতৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি? সে বলে তারা আরে ক্ষেপে যাবে এ ভয়ে কাউকে জানায়নি। বাবার কাছে জানতে চাইলাম আপনারা কি করেছেন? তিনি বলেন -আমরা তো কিছু জানতামই না।পরীক্ষার আগে স্কুল পরিবর্তনের গোঁ ধরাতে জানতে পারি।
আমরা পরিবারের সদস্যরা  অনেক পরে জানি আমার সন্তান মাদকাসক্ত,ধর্ষণে লিপ্ত, হত্যা খুনের সাথে জড়িত বা অন্য কোন অনৈতিক, অবৈধ কাজে লিপ্ত অথবা এই ছেলের মতন তারা বিপদগ্রস্ত, ব্লাকমেইলের শিকার বা হেনস্তা লান্চনা শিকার।
প্রতি বছর ১০অক্টোবর পালন করা হয় " বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য "দিবস।এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ঃ "পরিবর্তিত বিশ্বে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য"। অন্তত এ দিবসের প্রতিপাদ্যের কারনে হলেও আমাদের খোঁজ নিতে হবে আমাদের তরুনরা কেমন আছে।জাতিসঙ্গের সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৪-২৮ বছর বয়সী ছেলে মেয়েরা হচ্ছে তরুন।
দিন দিন এ তরুনদের মাঝে বাড়ছে  অধৈর্যতা,স্হিতিহীনতা,সহিংসতা, আত্মহত্যা,মাদকাসক্তি সহ বিভিন্ন মানসিক রোগ।যাদের মানসিক রোগ হয় তাদের  ৫০% এর  ঐ রোগের প্রথম লক্ষণ ১৪ বছরের মধ্যেই দেখা দেয়। আবার লক্ষণ দেখা দেওয়া ও চিকিৎসা নেওয়ার মধ্যে ফারাক থাকে প্রায় ৫ বছর। আমাদের এই অজ্ঞতা ও অসচেতনতা কাটিয়ে উঠতে হবে, কেননা জীবনকে সুন্দর, স্বার্থক,সুখী করতে  হলে শৈশব থেকেই ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে।
কিছু সংখ্যা তথ্য ঃ কৈশোর -তারুণ্যে আত্মহত্যা হচ্ছে মৃত্যুর ২য় সর্বোচ্চ কারন( বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) ;প্রতি ১০ মিনিটে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একজন কিশোরী সহিংসতার কারনে মারা যায়(ইউনাইটেড ন্যাশনস চিলড্রেন ফান্ড) ;৮৩% তরুণ মনে করে বুলিং তাদের আত্মমর্যাদার উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে(ডিসথেলেবল ডট অরগ);ট্রান্স-জেন্ডার তরুনদের ৫১% আত্মহত্যার চিন্তা করে, ৩০% আত্মহত্যার চেষ্টা করে (সেন্টার ফর ট্রান্স ইউথ হেলথ এট চিলড্রেন হসপিটাল,লসএনজেলস) এবং ২০% তরুণ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভুগে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) ।
সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা ঃ(১) সাইবার বুলিংঃউপরে যে স্কুল বদলানোর ছেলের কথা বলকাম এটি তার একটি উদাহরণ। ইমেইলে,টেক্সটে বা অনলাইন পোস্টে বিব্রতকর বা হুমকিজনক ছবি বা তথ্য দেওয়া ;এমন মন্তব্য ও পোস্ট যা ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে বা তাকে আহত করে ;অথবা আক্রমনাত্বক বা বিদ্বেষ মূলক যে কোন আচরণকে - সাইবার বুলিং বলা হয়।২০% জন নারী সাইবার বুলিং এর শিকার হন এবং ৯২% টিন-এজ প্রতিদিন অনলাইনে থাকে (স্টপ বুলিং ডট অরগ)। এরকম বুলিং এর জন্য হাজার হাজার ছেলে মেয়ে শুধু মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছে না,তারা পারিবারিক ও সামাজিক  সমস্যায় পড়ছেন, মানসিক রোগে ভুগছে, পড়াশোনা ক্যারিয়ার নষ্ট হচ্ছে সর্বোপরি অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে। (২) নির্যাতন ঃপরিবার ও অন্যত্র তরুণরা শারীরিক, মানসিক, যৌন ও আবেগীয় নির্যাতনের সম্মুখীন হয়।এছাড়া অবহেলা, বন্চিত হওয়া তো রয়েছেই।
(৩)সহিংসতা ও মাদকাসক্তিঃধর্ষন,হত্যা, ছিনতাই,  প্রভৃতি মারাত্মক অপরাধ মূলক কাজে অনেক তরুণ জড়িয়ে যাচ্ছে। গ্যাং কালচার, ডিসকো পার্টি সহ নানান রকম নিত্য নতুন অপকর্ম, অপসংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ছেন আমাদের সন্তানরা।(৪)আত্মহত্যা ঃপ্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৮ লক্ষ লোক আত্মহত্যা করে, এর মধ্যে তরুনদের মৃত্যুর ২য় সর্বোচ্চ কারন হচ্ছে আত্মহত্যা। ৭৮% আত্মহত্যা ঘটে আমাদের মতন নিন্ম ও মধ্যম আয়ের দেশে। আত্মহত্যার আচরণের মধ্যে রয়েছে -আত্মহত্যার চিন্তা বা পরিকল্পনা, আত্মহত্যার চেষ্টা ও আত্মহত্যা।
যেভাবে বুঝবেন কেউ আত্মহত্যার ঝুকিতে রয়েছেন কিনা ঃমরতে চাওয়া, নিজকে হত্যা করতে চাওয়ার ইচ্ছা পোষন;আশাহীন ও শুন্যতাবোধ,বেচে থাকার যুক্তি নেই মনে করা ;আত্মহত্যার প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ;জীবনের ঘেরাটোপে আটকে গেছি ও এর কোন সমাধান নেই মনোভাব ;অসহ্য যন্ত্রনা ( শারীরিক বা মানসিক) ;অন্যদের বোঝা হয়ে আছি মনে করা ;পরিবার, বন্ধু থেকে নিজকে গুটিয়ে নেওয়া ;ক্রোধ দেখানো, প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা ; আবেগ বা মন- মেজাজের অস্বাভাবিক উঠা- নামা ( তীব্র অশান্তি থেকে হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া বা সুখী হয়ে উঠা।আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেললে অনেক রোগী "রিলিফ " ফিল করে ও সব যন্ত্রণার অবসান হতে যাচ্ছে ভেবে শান্ত হয় এমনকি সুখী ভাব দেখা দেয়)।
মনে রাখতে হবে যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় পরবর্তীতে আত্মহত্যা করার ঝুকি সাধারনের চেয়ে ৫০-১০০ গুন বেশি। আত্মহত্যার কথা বলা ও চেষ্টাকে তাই খাটো করে দেখার উপায় নাই এবং এরা প্রকৃত আত্মহত্যা করবে না এরকম ভাবা সঠিক না।(৪)নিজকে ক্ষত/আহত করা(সেল্ফ হার্ম)--আত্মহত্যার ইচ্ছে নেই তবুও নিজ ইচ্ছায় নিজকে আহত করা কিছু আবেগ তাড়িত তরুন তরুণীদের বদ অভ্যাসে দাড়িয়ে যায়।পরিবার, দাম্পত্য জীবন বা প্রেমের সম্পর্কে সামান্য মানসিক আঘাত পেলে, আকাঙ্খা পূরন না হলে বা ম্যানপুলেট করতে তারা হাত কেটে ফেলে, ঘুমের ঔষধ খায়,ক্ষতিকর কিছু গলাধকরন করে(স্যাভলন),শরীরের অংশ বিশেষ পুড়িয়ে ফেলে ইত্যাদি।
যা করনীয়ঃসামান্য কিছু ভাল কাজই অনেকের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। আমেরিকায় নিউইয়র্কে " মেন্টাল হেলথ এডুকেশন ইন স্কুলস 'ল " নামে একটি আইন পাস করা হয়েছে। এই আইনে নিউইয়র্কের কিন্টারগার্ডেন থেকে দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত সকল স্কুল কলেজে সকল ছাত্র ছাত্রীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য  বিষয়ে শিক্ষা দান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের দেশে ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে স্হান দিতে হবে। শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নানামুখী প্রচার ও প্রোগ্রাম রয়েছে। যেমন হাত ধেয়া,দাত মাজা,ভাল পুষ্টি, ব্যায়াম। একই রকম প্রচার ও প্রোগ্রাম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য থাকবে না কেন?ঢাকা মেডিকেলে ছাত্র ছাত্রীদের "শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য " নিয়ে একটি ক্লাসের পর এক ছাত্রী জিজ্ঞেস করলো "স্যার টিভিতে আপনার সন্তানকে ওরস্যালাইন খাওয়ান বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়।আপনার ক্লাশ শুনে মনে হচ্ছে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে এরকম বিজ্ঞাপন দেওয়া আরো জরুরি "।
উন্নত দেশগুলোতে স্কুল কলেজ থেকেই "সোশাল ইমোশনাল লার্নিং " (এসইএল)  শেখানো হয়।এতে থাকে ঃআত্মসচেতন হওয়ার শিক্ষা ;আত্ম ম্যানেজমেন্ট কৌশল ;সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ;সম্পর্ক দক্ষতা ;দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা। এছাড়া তরুণদের শেখাতে হবে যে কোন চাপ,দুর্যোগ বিপর্যয়ের পর কিভাবে ঘুরে দাড়াতে হয় ও দুরুত স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা যায়।এর মধ্যে রয়েছে  ঃসহযোগিতাপূর্ন ব্যক্তিগত সম্পর্ক ;সমস্যা সমাধানে ভাল দক্ষতা ;কখন,কোথায়, কার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে হবে তা জানা।
সর্বশেষে বলবো তরুণদের সঙ্গে যেন পরিবারের থাকে অকপট, খোলামেলা, সৎ যোগাযোগ,তাদের "ক্ষমতায়িত" করতে হবে যেন নিজ দায়িত্বে "পরিস্থিতি সামাল "দিতে পারে  এবং পরিবারে  যেন একটি " প্রযুক্তি মুক্ত "(টেক ফ্রি) সময় থাকে, যখন পরিবারের সবাই একত্র হয়ে নিজেদের মতন করে সময় কাটাতে পারেন।

প্রফেসর ডা. তাজুল ইসলাম
প্রফেসর অব সাইকিয়াট্রি
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।
ইমেইল ঃdrtazul84@gmail.com
Phone :01715112900