Saturday, May 13, 2017

সাইকোলজিক্যাল টিপস-৩০:মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন

পর্ব-৩: কয়েকটি মাইন্ডফুলনেস প্রাকটিস
........................................
১। হাটার  মেডিটেশন : সময়- ১০ মিনিট
ক) সচরাচর যে গতিতে হাটেন সে গতিতেই রাস্তায় হাটুন।সড়কের যে আলোগুলো,যে সব মানুষ রাস্তায় যাতায়ত করছে সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিন।তবে মেধাহীন ব্যক্তির ন্যায় অসচেতন ভাবে তাকাবেন না।পূর্ন আগ্রহ ও কৌতুল নিয়ে তাকান( আমি পুঃরনো ঢাকায় বিকেলে একা হাটতাম আর চারপাশের মানুষ জন,দোকান,বাসা সব কিছু অনেক আগ্রহ ও কৌতুল নিয় তাকাতাম।এমনকি রাস্তার পাশের বাসার দরজা- জানালা দিয়ে যতটুকু দেখা যায় উকি দিয়ে তা ও দেখতাম। এতে একবার এক সহযাত্রী সতর্ক করে দিলো এভাবে অন্যদের ঘরের ভিতর তাকালে মার খেতে হতে পারে।কেননা তারা ভাবতে পারে আপনি চোর বা তাদের ঘরের ভিতরের মেয়ে- মহিলাদেরকে দেখার চেষ্টা করছেন।তথাপি আমার সে অভ্যাস এখনো আছে।ইনশাল্লাহ বিপদ হয়নি। বরং এখনো দেশে বা বিদেশে ঘুরতে গেলে আমি ভ্রমন পথের( তা বাস,ট্রন যাই হোক) চারপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য ও চলমান জীবন্ত খন্ড নাটক দেখতে দেখতে যাই।মূল স্পটের চেয়ে যাত্রাপথের এই অভিজ্ঞতা অনেক তৃপ্তিদায়ক ও উপভোগ্য।
মূলত চারপাশে যে জীবন্ত নাটক- সিনেমার খন্ড দৃশ্য বয়ে যাচ্ছে আপনি অনুসন্ধিসন্যু হলে এগুলো বেশ উপভোগ করবেন।
খ) সোজা হয়ে হাটুন তবে বেশী চাপ দিবেন না।প্রতিবার মাটিতে পা রাখার সময় কেমন লাগছে তা অনুভব করুন।শরীরের ওজন যেন সবদিকে সমভাবে বিতরন হয়।
গ)বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বাকিয়ে হাতের তালুর দিকে নিন ও বাকী আঙ্গুলগুলো দিয়ে এটিকে আবৃত করে রাখুন।এবার এটি পেটের উপর স্হাপন করুন।এবার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর ভিতর ঢুকিয়ে দিন।

২। নিজের বর্তমান অবস্হানকে পূর্নভাবে অনুভব করুন ও অন্যদের দিকে মনোযোগী হোন,তাদের কথা শুনুন আগ্রহ ও কৌতুল নিয়ে।
৩। নীরবে লক্ষ্য করুন আপনার ভিতর কি ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে - চিন্তা সমূহ,অনুভূতিগুলো,বাছ- বিচার সমূহ( জাজমেন্টস),স্মৃতিগুলো।
পরে যার সঙ্গে কথা বলছেন তার দিকে পূর্ন মনোযোগ দিন।
২. শোনার  ও দেখার মেডিটেশন :.......

৩। দয়ালু হওয়ার মেডিটেশন : অন্যের প্রতি দয়া দেখাতে হলে আগে নিজের প্রতি সদয় হতে হবে।নিজের যত্ন নেওয়া তত সহজ কাজ নয়।ভালোবাসা গ্রহন করা,প্রশংসা গ্রহন করা ও আমি সুখী হওয়ার অধিকার রাখি- এগুলো আমাদের গতানুগতিক চিন্তার মধ্যে থাকে না।ভেবে দেখুন- ভবিষ্যৎ এর আশঙ্কা, বিপদ নিয়ে চিন্তা করে, অতীতের কর্ম নিয়ে আফসোস করে,অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করে,নিজকে কঠিনভাবে সমালোচনা/ মূল্যায়ন করে,এরপর কি ঘটতে যাচ্ছে ইত্যাদি ভেবে আমরা নিজেদের কত বেশী শক্তি নিঃশেষ করছি।
এখন ভাবুন ঐ পুরো শক্তি একত্রিত হয়েছে ও আপনার কাছে ফিরে এসেছে। "ভালোবাসা/ দয়ার" মেডিটেশন করে আমরা নিজকে পুনরায়  সঠিক অবস্হানে নিতে পারি।নিজের প্রতি যত্ন নেওয়া হবে আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। এই ভিত্তি ভূমির উপর দাড়িয়ে আপনি অন্যদেরকে এই " দয়ার/ভালোবাসার" ক্ষেত্রে নিয়ে আসতে পারবেন।
কিভাবে করবেন?
মনে মনে নিঃশব্দে নিজের ও অন্যের ভালো গুনাবলী গুলো নিজের সঙ্গে বার বার বলতে থাকুন
ক) নিজের ভালোত্ব নিয়ে ভেবে উৎফুল্ল হোন।যে সব কাজ সদয়ের সঙ্গে করেছেন সেগুলো স্মরন করুন এবং এই স্মৃতিচারনকে তৃপ্তির সঙ্গে উপভোগ করুন।
খ) নিজের জন্য  চান এমন স্হায়ী  ও গভীর ভালো কিছু গুনাবলী মনে মনে নিজকে শোনান।যেমন : আমি যেন নিরাপদে ও সুস্হ থাকি,আমি যেন সুখ ও আনন্দে জীবন- যাপন করি,আমার ভালো শারিরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য রয়েছে,আমি যেন সহজভাবে জীবন- যাপন করতে পারি- ইত্যাদি।
গ) এই কথাগুলো দ্রত নয়,ধীরে ধীরে বলুন যেন কিছু স্পেইস থাকে।ফলে একটি ছন্দ তৈরী হবে যা আপনার জন্য  প্রীতিদায়ক।একেকবার একেক বানীর দিকে মনোযোগ দিন

ঘ) যতবার লক্ষ্য করবেন মনোযোগ সরে গেছে ততবার নিজের প্রতি সদয় হোন।কোনভাবে বিরক্ত না হয়ে মনোযোগ পুনরায়  ফিরিয়ে আনুন।
ঙ) কিছু সময়ের পর মনোজগতে একটি দৃশ্য কল্পনা করুন( ভিজিউলাইজেশন)। দেখুন আপনার প্রতি সদয় ও আপনাকে অনুপ্ররনাকারী ব্যক্তিরা একটি বৃত্ত তৈরী করে দাড়িয়েছে এবং এই বৃত্তের কেন্দ্রে আপনি।হয়তো তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে বা তাদের সমন্ধে কোথাও পড়েছেন; হয়তো তারা এখনো জীবিত বা ঐতিহাসিক ভাবে বেচে আছে বা এমনকি মিথ হিসেবে বেচে আছে।
বৃত্তের কেন্দ্রে নিজকে অবলোকন করুন ও দেখুন আপনি তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠ  মনোযোগ পাচ্ছেন।শান্তভাবে নিজকে ভালোবাসার বানীগুলো রিপিট করতে থাকুন
।এরপর মনের দৃশ্যায়ন বন্ধ করে  আরো কয়েক মিনিট ঐ ইতিবাচক সাজেশনগুলো রিপিট করুন।যতবার আপনি এমন  করবেন ততবার আপনি নিজের সঙ্গে নিজের যে পুরনো,ক্ষতময় সম্পর্ক সেটিকে সুস্হ ও ভালোবাসার সম্পর্কে রূপান্তরিত করতে পারবেন
( শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না।তথাপি আগামী সংখ্যা য় যেভাবেই হোক মেডিটেশন পর্ব  শেষ করে দেবো।শেষ পর্বে থাকবে যাদের সময় কম কিভাবে ১ মিনিটে মাইন্ডফুলনেস প্রাকটিস করতে পারবেন)

Tuesday, May 9, 2017

সাইকোলজিক্যাল টিপস-৩০: মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন

পর্ব-২:( দয়া করে পর্ব-১ আবার পড়ে নিন)
কিভাবে আমরা অধিকতর মাইন্ডফুল হতে পারি?
১। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে নিজকে মনে করে দেওয়া যে আমি আমার চিন্তা,আবেগ-অনুভূতি,মন-ছবি,শারিরিক সেনসেশন ও চারপাশের পৃথিবীকে   নিয়মিত নোটিশ করে যাবো
২। প্রতিদিন মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করুন- দৈনন্দিন জীবনকে, যে খাদ্য খাচ্ছেন, হাটার সময় বাতাস যেভাবে শরীরের বিভিন্ন অংশে বয়ে যাচ্ছে। মনে হতে  পারে এগুলো হাস্যকর ও ছোটখাট ব্যাপার কিন্তু আমাদের " অটো পাইলট" হিসেবে গতানুগতিক চলার ক্ষেত্রে এগুলো ভালো ব্রেক দিতে সক্ষম।আমাদের দরকার অটোপাইলট হিসেবে না চলে ক্ষনে ক্ষনে " বর্তমানে" মনোযোগ দেওয়া এবং সেটি সম্ভব শুধু এভাবে প্রতিদিন নিজের বর্তমানের অবস্হানকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করা ও তা উপভোগ করা
৩। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় এর জন্য ঠিক করে রাখুন- হয়তো অফিসে যাওয়ার যাত্রা পথে বা দুপুরে লান্চ করতে যাওয়ার সময়।এই সময়টিতে পৃথিবী যে সেনসেশন তৈরী করে চলছে সেদিকে নজর দিন
৪। নতুন কিছুর চেষ্টা করুন- মিটিং এ নতুন কোন সিটে গিয়ে বসুন বা নতুন জায়গায় গিয়ে লান্চ করুন( যাতে নতুনতর সেনসেশন,অনুভূতি অনুভব করতে পারেন)
৫। নিজের চিন্তার দিকে মনোযোগ দিন:

একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন।বর্তমান মুহূর্তটি যেরকম হুবহ সেরকমভাবে এটি পর্যবেক্ষণ করুন।আপনার লক্ষ্য হবে বর্তমান মুহূর্তকে কোনরকম জাজমেন্ট না করে,ভালো মন্দ বিচার না করে শুধু এর প্রতি মনোযোগী হওয়া( মনকে চিন্তামুক্ত বা শান্ত করার চেষ্টা নয়)। তবে  এটি ঠিকভাবে  করতে পারলে মন ঠিকই শান্ত হয়ে আসবে,মনের ভিতর চিন্তার উত্তাল ঢেউ শান্ত হয়ে মন প্রশমিত হবে।
চোখ বন্ধ করে মনের দিকে নজর দিন। দেখবেন শত সহস্র চিন্তা- দুশ্চিন্তা মনের ভিতর বয়ে যাচ্ছে। মাইন্ডফুলনেস মানে এই নয় এ চিন্তাগুলো দূর করে দিতে হবে।আপনার লক্ষ্য হবে চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে না গিয়ে,চিন্তা থেকে নিজকে বিচ্ছিন্ন রেখে, দূর থেকে চিন্তা স্রোতকে অবলোকন করা।
বাস স্টান্ডে যেমন অনেক বাস আসে যায়, সেভাবে চিন্তাকে দেখুন।তবে কোন চিন্তা-বাসে আরোহন করবেন না।দেখবেন বুদবুদের মতন কিছু চিন্তা চুপ করে উঠে টুপ করে পরে যাচ্ছে। আবার অনেক চিন্তা দ্রত আসছে ও দ্রত চলে যাচ্ছে। মূলত কয়েকটি চিন্তাই হয়তো ঘুরে ফিরে আসছে( যেগুলো আপনার দুশ্চিন্তার উৎস)। চিন্তার স্রোত আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইবে,আপনি হাল্কা করে নিজকে তা থেকে মুক্ত করে আবার দূর থেকে পর্যবেক্ষকের মতন মনোরাজ্যে কি ঘটে চলছে সেদিকে মনোযোগ দিন।প্রথমদিকে এটি কঠিন মনে হবে,নিজকে চিন্তা বিযুক্ত রেখে চিন্তাকে অবলোকন করতে।তবে প্রাকটিস চালিয়ে গেলে এটি সহজ হয়ে আসবে।মন কেন বিক্ষিপ্ত থাকে,কেন চিন্তা ইচ্ছামত ঘুরাফিরা করে - নিয়ন্ত্রণ করতে কেন পারছি না,এরকমটি ভেবে মনকে আরো অস্হির করবেন না।
মনের কাজই ছুটে বেড়ানো।এটিকে সদয় দৃষ্টিতে দেখুন।যে চিন্তাই মনে আসে সেটি ভালো না মন্দ তা যাচাই করবেন না।চিন্তাকে নিছক " মানসিক ঘটনা" হিসেবে দেখুন।অন্য মেডিটেশনে যেমন শ্বাস - প্রশ্বাসের দিকে মনোনিবেশ করা হয় এখানে মনোযোগ মনোরাজ্যের দিকে- তার চিন্তা,অনুভূতি প্রভৃতির দিকে।মন ছুটে যাবে এদিক সেদিক আপনি এর জন্য ক্ষিপ্ত, বিরক্ত না হয়ে একে চমৎকার খেলা হিসেবে নিন।শিশু যেমন পরম কৌতুল নিয়ে কিভাবে ট্রেনগুলো প্লাটফর্ম থেকে এদিক সেদিক যাচ্ছে তা দেখে থাকে, আপনি ও চিন্তা- ট্রেনকে সেভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।

কয়েক মিনিট চিন্তা পর্যবেক্ষণ এর পর দেখুন মনের ভিতর কি কি দৃশ্য ভেসে উঠছে( এই মন ছবিগুলোও ঐ দুশ্চিন্তা সংশ্লিষ্ট - কে কি বলেছে,কি ঘটনা ঘটেছে যা আপনাকে পীড়া দিচ্ছে।) এগুলো থেকেও নিজকে বিচ্ছিন্ন রেখে নিছক সেগুলো দর্শকের মতন পর্যবেক্ষণ করুন

এর পর দেখুন মানসিক অবস্হা কেমন।

অর্থ্যাৎ কি ধরনের আবেগ-অনুভূতি মনে কাজ করছে।এটি কি টেনশন, নাকি অশান্তি নাকি রাগ- ক্রোধ,হতাশা,লজ্জ্বা,অপমানবোধ নাকি অন্য কোন অনুভূতি।কিছুক্ষণ সে অনুভূতিগুলো গভীরভাবে অনুভব করুন। কোন অনুভূতিকে এড়িয়ে যাবেন না,হাল্কা করে চলে যেতে দেবেন না- গভীর ভাবে তা অনুভব করুন।গভীরতার চাপে দেখবেন অনুভূতির নরম থলে গলে গেছে,সেগুলো মনে ছড়িয়ে পরে হাল্কা হয়ে মন থেকে ক্রমশ উবে যাচ্ছে।

এরপর মনোযোগ দিন শরীরের সেনশেসন এর দিকে।
পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রতিটি অংশে মনোযোগ দিন ও প্রতি অঙ্গে কিরকম সেনসেশন টের পাচ্ছেন তা লক্ষ্য করুন( ঠান্ডা,গরম,ব্যথা,চাপ..)।

এভাবে ১০-১৫ মিনিট চিন্তা, অনুভূতি,মনছবি ও শারিরিক সেনসেশন নিরীক্ষণ করার পর চোখ খুলে উঠে বসনু।কাগজ- কলম নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাগুলো  কি কি ছিল তা লিখে রাখুন।এই অটোমেটিক থটগুলো আপনার অবচেতন মনের অনেক রহস্য উন্মোচন করবে( আমরা মনোচিকিৎসকরা  সিবিটি - সাইকোথরাপির সময় এই চিন্তা বিশে্লষন করে রোগীর চিন্তা- বিভ্রাট, চিন্তায় গলদ কোথায় ও কিভাবে এ গলদের সৃষ্টি হয়েছে তা বের করে থাকি।রোগীর চিন্তা,বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরনের পরিবর্তন করেই আমরা মানসিক রোগ নিরাময় করে থাকি)।
এই মাইন্ডফুলনেস প্রাকটিস আপনার মনকে যেমন প্রশান্ত করবে,তেমনি চিন্তা বিশ্লেষণ করে চিন্তার ক্রটি সংশোধন  করে মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে।
( পরবর্তী পর্বে- সুনির্দিষ্ট কিছু মাইন্ডফুল প্রাকটিস নিয়ে আলোচনা)

Sunday, May 7, 2017

পরীক্ষা বা যেকোন ব্যর্থতা মোকাবিলায় করনীয়

গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বেশী।এই ফেল করা ছাত্র ছাত্রীদের কেউ কেউ হতাশা,গ্লানি, ক্ষোভে আত্মহত্যা করছেন বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে।কৈশোর - তারুন্যে আত্ম হত্যার একটি অন্যতম কারন  পরীক্ষায় ফেল করা।কেন এমনটি হয় ও এর প্রতিকার কি? স্কুল- কলেজের পরীক্ষায় কেন জীবনের সকল ধরনের পরীক্ষায় পাশ- ফেল অনিবার্য ঘটনা।জীবন কখনোই কারো জন্য কেবলই কমেডি ছিল বা থাকবে তেমনটি নয়,মাঝেমধ্যে ট্রাজেডি ও নেমে আসে।জীবন হচ্ছে সফলতা- ব্যর্থতার পালা- বদলের এক অবিরাম ধারা।কখনো কখনো এ পট- পরিবর্তন উপর্যুপরি  ঘটতে পারে।পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা যে কোন ব্যর্থতার পর কেউ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে,কেউ তীব্র নেতিবাচক আবেগে বিস্ফোরিত হন( এরাই আত্মহত্যার চেষ্টা নেয়), আবার কেউ সাময়িক আপ-সেট থাকেন মাত্র।কে কোন ধরনের আবেগীয় প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তা অনেক দেহ- মনো- সামাজিক কারনের উপর নির্ভর করে।

পরীক্ষায় ফেল করার পর একেবারে  মুছড়ে পরেন,ভেঙ্গে পরেন,আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তারা যাদের ১। সহনশীলতা কম( টলারেন্স) ২। বিপর্যয়ের পর দ্রত ঘুরে দাড়াবার ক্ষমতা  কম( রিজিলিয়েন্স) ৩। পরিবার থেকে বা নিজ থেকে  অবাস্তব  অতি" উচ্চ প্রত্যাশা" যাদের ৪। ফেল করার পর পরিবার বা অন্যদের থেকে তাচ্ছিল্য, অপমান পেলে ৫। পরীক্ষা পাশই জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র উপায় বলে বিশ্বাস তৈরী হলে- ইত্যাদি।

যারা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন বা হবেন তাদের মনে রাখা ভালো পৃথীবীর অনেক সফল,বিখ্যাত ব্যক্তিরা পড়াশোনায়  তেমন ভালো করতে পারেননি।তাদের মধ্যে রয়েছে: ব্রিটেনের প্রাক্তন  প্রধান মন্ত্রী উইনস্টিন চার্চিল( যিনি আবার সাহিত্য নোবেল পান), বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন, স্টিভ জবস,বিলগেটস এমনকি আইনস্টাইন। আপনি ব্যর্থ হয়ে যদি এই  " ব্যর্থদের দলে" অন্তর্ভূক্ত হন সেটি খুব একটি " মন্দ দল" হবে না নিশ্চয়।বার্নার্ড 'শ এর কথা স্মরন করুন,তিনি বলেছেন" যখন আমি তরুন ছিলাম দেখলাম ১০ টি কাজের মধ্যে ৯টিতেই আমি ব্যর্থ  হচ্ছি।তাই আমি সকল কাজে ১০ গুন বেশী পরিশ্রম  করা শুরু করি"। আপনি কি তেমন করছেন?
যারা ফেল করেছেন বা করবেন তাদের করনীয়:

১। অতিরিক্ত আতঙ্কিত হবেন না- এটিই জীবনের শেষ নয় এবং একমাত্র আপনি একাই ব্যর্থ হননি।আরো অনেক পথ খোলা রয়েছে,অনেক পথ পেরোতে হবে
২। ব্যর্থ হলে হতাশ হওয়া,বিপর্যস্ত হওয়া,রাগ,ক্রোধ, গ্লানি, অপমানে জর্জরিত হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার।এ "শোক" সয়ে যাওয়ার জন্য নিজকে কিছুটা সময় দিন- ব্রেক নিন।সময় সকল ক্ষতের উত্তম নিরাময়ক
৩। আপনি এখন খুবই খারাপ অনুভব করছেন।নিশ্চয়  চাইবেন না ভবিষ্যৎ ও তেমন খারাপ কিছু ঘটুক।তাই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে ঘটনাটি পুন: মূল্যায়ন করে,সৃজনশীল ভাবে চিন্তা করুন আমি যেমনটি চাই তেমনটি পেতে হলে আমাকে কি কি করতে হবে? জীবনের সহজ আনন্দ গুলো উপভোগ করুন।
৪। কোন একটি ব্যর্থতা দিয়ে নিজকে সংজ্ঞায়িত করবেন না - ব্যর্থতা একটি ঘটনা মাত্রয় ।কোন মানুষ ব্যর্থ নন,তার কিছু চেষ্টা, কাজ ব্যর্থ হতে পারে।বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন এর কথা মনে করুন " আমি ব্যর্থ হইনি।আমি মাত্র  জেনেছি  ১০ হাজার  উপায় রয়েছে যেগুলো কোন কাজে আসে না।" অর্থাৎ উনি ১০ হাজার বার ব্যর্থ হয়েও নিজকে ব্যর্থ বলতে নারাজ।আর আপনি কতবার ব্যর্থ হয়েছেন?
৫। যদি আপনি দেখাতে পারেন, যে কোন ব্যর্থতাকে আপনি মোকাবিলা করতে পারেন তাহলে কেউ মনে রাখবে না যে আপনি ব্যর্থ  হয়েছিলেন।
৬। কিছু ঘটনাকে আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন না বটে, কিন্তু সেটি কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখবেন ও এর প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া কি ধরনের হবে সেটি আপনি নিয়ন্ত্রন করতে পারেন
৭। নিজকে বিচ্ছিন্ন করবেন না- পরিবারের লোক, বন্ধুবান্ধব সবার সঙ্গে সংযোগ রাখুন।গ্লানি,অপমান,কষ্ট চাপিয়ে রাখবেন না।প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে থাকুন।নিজের উপর যেমন নির্ভর করবেন, তেমনি শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপর ও নির্ভর করুন

৮। নিজের যত্ন নিন- যা ভালো লাগে করুণ, সামাজিক যোগাযোগ বাড়িয়ে দিন,ভালো ঘুম দিন,পুষ্টিকর খাবার খান,ব্যায়ম করুন। কোথায় ও কার কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে তার একটি লিস্ট তৈরী করুন ।
৯। আবেগকে "বোতল বন্ধি" করে রাখবেন না।এগুলো যথাযথ ভাবে প্রকাশ করুন।অনুভূতি গুলোকে চিন্হিত করুন,সঠিক নাম দিন( রাগ,হতাশা,ভয়,লজ্জ্বা)। অনুভূতিগুলোকে প্রক্রিয়াকরনে কিছুটা সময় দিন।
১০। ভাবুন আপনি একাই কি হেরেছেন? এই হারার জন্য সবাই কি আপনাকে অপছন্দ করছে,অবজ্ঞা করছে,তিরস্কার করছে বা দূরে সরিয়ে দিয়েছে? খেয়াল করলে দেখবেন ঘটনা পুরোপুরি  এতো খারাপ নয়।অনেকেই আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল ও  সহমর্মি।
১১। ঘটনাকে ভয়াবহকরন করবেন না-( কোনভাবেই আমার পক্ষে উঠে দাড়ানো সম্ভব না) বা নিজকে অতিরিক্ত দোষারোপ করবেন না( আমি অথর্ব,পুরোপুরি ব্যর্থ মানুষ)।
১২। এতো ভগ্নমনোরথ অবস্হায় ও আশাবাদী হোন।আশঙ্কা,ভীতির দিকে নজর না দিয়ে যা অর্জন করতে চান তার একটি ইতিবাচক মন- ছবি( ভিজিউলাইজেশন) মনের ভুবনে তৈরী করুন।
১৩। ব্যর্থতার কারন নিয়ে ভাবুন- যা ঘটেছে বিস্তারিত সব লিখুন,সম্ভাব্য সমাধান কি খুজে বের করুন ও কি কি বাধা আসতে পারে তাও লিখুন,প্রত্যশাকে বাস্তবভিত্তিক করুন।
১৪। ঘটনার পরও জীবন চলবে- ব্যর্থ হয়েছেন তার মানে কেয়ামত হয়ে যায়নি।জীবন জগত আগের মতনই চলবে।আপনি পরিবর্তিত হবেন, জীবন পরিবর্তিত হবে- কিছুই  একরকম থাকবে না।একই রকমভাবে  আপনার এই দুঃসময় ও টিকে থাকবে না।সামনে তাকান, উঠে দাড়ান,অল্প করে হলেও চলতে থাকুন।
১৫। অনলাইনে বিভিন্ন পেইজে মানসিক সহায়তামূলক  লেখা থাকে সেগুলো পড়ে দেখতে পারেন (ফেইসবুকে " বি পজিটিভ বি হ্যাপী" নামে আমাদের ও একটি গ্রপ আছে।আমরা নিয়মিত সেখানে অনুপ্রেরণামূলক পোস্ট দিয়ে থাকি)। যদি খুব বেশী ভেঙ্গে পরেন প্রফেশনাল কাউন্সিলিং গ্রহন করুন।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্হা:
ব্যর্থতা, বিপর্যয় এ যাতে আমাদের সন্তানরা সহজে মুছড়ে না পরে,ভেঙ্গে না পরে সে জন্য তাদের মানসিক কাঠামো সবল,দৃড়  করে গড়ে তুলতে হবে;হতাশা সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে( টলারেন্স);মানসিক নমনীয়তা বাড়াতে হবে( ফ্লেক্সিবল);  ও ঘাত-সহ  হওয়া  বা বিপর্যয়ের পর দ্রত উঠে দাড়াবার,ঘুরে দাঁড়াবার মতন সক্ষম হতে হবে( রেজিল্যান্স)। 

এর  জন্য আমাদের করনীয়:

১। পরিবারে ও বাইরে যত্ন,সমর্থন, সহায়তামূলক পরিবেশে বেড়ে উঠার সুযোগ থাকতে হবে;ভালোবাসা, বিশ্বাস ও নিরাপত্তা বোধ নিয়ে বেড়ে উঠার পরিবেশ থাকতে হবে এবং উৎসাহ ও আশ্বস্তকরনে সহায়ক শুভাকাঙ্খী থাকতে হবে।
২। ইতিবাচক জীবন দৃষ্টি তৈরী করতে হবে( পজিটিভ আউটলুক)- এর মধ্য থাকবে আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ এর দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং তীব্র আবেগ ও অনুভূতি ম্যানেজ করা সক্ষমতা
৩। সাহস ও সহিষ্ণুতার গুন তৈরী করা ( গ্রিট)- গ্রিট হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদী লক্ষ্য অর্জনের জন্য অধ্যাবসায়ী হওয়া এবং এর জন্য প্রবল অনুরাগ ও উৎসাহ থাকা;ব্যর্থতা সত্বেও,  প্রবল বাধা,প্রতিকূলতা সত্বেও, বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং অব্যাহত ভাবে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার মানসিক- চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকা। এরা কর্ম সম্পাদন বলতে " ম্যারাথন " বোঝায়,তাৎক্ষনিক কোন লক্ষ্য অর্জনকে নয়( এবারের পরীক্ষায় পাশই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়,দীর্ঘ মেয়াদী জীবন সফলতা তাদের লক্ষ্য) । তাই এরা আত্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; লক্ষ্য অর্জনে সব সময় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে( একবার ফেল করেই হাল ছেড়ে দেয় না); তাই আবেগতাড়িত,ক্ষতিকর প্রবনতা দমিয়ে রেখে সুদূর ভবিষ্যৎ এর লক্ষ্যের দিকে মনোযোগ ফোকাস করে রাখে;( তাই ফেল  বা ব্যর্থতার কারনে এরা আত্মহত্যার চিন্তা করে না)। তাদের থাকে অবিচল জীবন লক্ষ্য, ফলে তাদের  কাছে জীবন হয় অর্থপূর্ণ ও আশীর্বাদ পূর্ন।
৪। মা- বাবা, পরিবারের দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানের মধ্যে বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী করে দেওয়া( অথচ অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত জিপিএ-৫ পাওয়া,পরীক্ষায় ১ম হওয়ার মতন অবাস্তব ও অপ্রয়োজনীয় লক্ষ্য আমরাই তাদের মানসে সেট করে দেই) ; ঝুকি- বিপদ সম্পর্কে কার্যকর যোগাযোগ স্হাপন করা( পরীক্ষার সম্ভাব্য  ফলাফল নিয়ে কতজন অভিভাবক বা শিক্ষক ছাত্র- ছাত্রীদের সঙ্গে পূর্ব কাউন্সিলিং করে থাকেন?); প্রতিকূল ও চ্যালেন্জিং পরিস্হিতি সমন্ধে ইতিবাচক পূন: মূল্যায়নে সহায়তা করা( পরীক্ষা - ভীতি বা পরীক্ষায় ফেল করার পর হতাশ সন্তানদের কতজন ইতিবাচক মূল্যায়নে সহায়তা করেন? যদি নিজেরা সমর্থ না হন,প্রফেশনালদের দ্বারা কাউন্সিলিং করান);
এবং সর্বোপরি  সন্তানের মধ্যে মানসিক দৃড়তা/ কাঠিন্য তৈরী করা( মেন্টাল টাফনেস- যা সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলায় তাদের সহায়তা করবে)।
এই মানসিক কাঠিন্যের ( হার্ডিনেস) প্রধান ভিত্তি হচ্ছে- ৩টি সি(c): কমিটমেন্ট,কন্ট্রোল ও চ্যালেন্জ।
সক্রেটিস বলে গেছেন " অ- পরিক্ষীত জীবন আদর্শ জীবন নয়"। তাই উত্তম জীবনের জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন কঠিন পরীক্ষা মোকাবিলা করেই একে আদর্শ জীবন হিসেবে বিনির্মাণ করতে হবে।ব্যর্থতা, কষ্টের মধ্য দিয়েই জীবনের মহত্তম বিকাশ ঘটে।ধৈর্য্য ও লেগে থাকা( পেশেন্স,পারসিভিয়ারেন্স) এ দুটি গুন থাকলে জীবনের কোন ব্যর্থতাই আমাদেরকে " থামিয়ে" দিতে," আটকে" দিতে পারবে না।আইনস্টাইন এ বিষয়ে বলেন" তুমি কতটুকু স্মার্ট সেটি বিবেচ্য নয়,বিবেচ্য হচ্ছে তুমি সমস্যার পিছনে কতটুকু লেগে থাকতে পারো"। তাই মনে রাখবেন আপনি কখনো কোন ব্যাপারে ব্যর্থ নন,যতক্ষণ না সে ক্ষেত্রটি থেকে আপনি পালিয়ে না যান।এবারের ব্যর্থতার পরই হয়তো আপনার জন্য অপেক্ষা করছে "সুবর্ন জয়",।অথচ সাময়িক হতাশার কারনে আপনি হালছেড়ে দিয়েছেন।টমাস এডিসনের পরামর্শ মনে রাখুন" জীবনের বেশীরভাগ ব্যর্থরা বুঝতে পারে না,সাফল্যের দ্বার প্রান্তে এসে তারা হাল ছেড়ে দিয়েছিল"। 
প্রফেসর ডা. তাজুল ইসলাম
সোশাল সাইকিয়াট্রিস্ট
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
কমিউনিটি এন্ড সোশাল সাইকিয়াট্রি বিভাগ
জাতীয় মানসিক স্বাস্হ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল,ঢাকা
মোবাইল :০১৭১৫১১২৯০০
ইমেইল :drtazul84@gmail.com

Friday, May 5, 2017

সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল-১০: আবুবাকার নামা( ভুল করে কেউ আকবরনামা পড়বেন না) এবং ফেইসবুকি ও চিত্ত- জ্বালা বনাম চিত্ত বিনোদন


কোনভাবেই এই বিষয়ে লিখতে চাচ্ছিলাম না।কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া অন্যায় বলে মনে হয়।অপ্রিয় হবার ভয় আমার কখনো ছিল না।এমনকি রীতিমত ঝুকি নিতেও কার্পন্য করিনি।
ফেইসবুক ব্যবহারে ফেইসবুক এডিকশন,অসামাজিক-অনৈতিক কাজ ও অপরাধ সহ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাস্ট্রীয়,আন্ত- রাস্ট্রীয় সমস্যা বেড়েছে  এটি অনস্বীকার্য। তথাপি গন- মানুষের মনন পঠনের জন্য  এটি একটি উত্তম মাধ্যম।(অন্তত আমার জন্য ফেইসবুক আশীর্বাদ)।
ফেইসবুকে সাম্প্রতিক কালে বাঙ্গাল বনাম বাঙ্গালী,ভদ্রলোক বনাম ভদ্দর লোকের সাহিত্য নিয়ে বেশ পান্ডিত্যপূর্ন,ব্যঙ্গ- রসাত্মক আলোচনা দেখছি।আমি সব ধরনের পোস্টই পড়ি- আম- জনতা থেকে বিশিষ্ট পন্ডিতদের।নিজের " বি পজিটিভ বি হ্যাপী" এর লেখাই অনেক জমা,তাই ইচ্ছে থাকলেও অন্য সামাজিক ইস্যু গুলো নিয়ে পোস্ট দিতে পারি না( যদিও আমি সব বিষয়েই যথেষ্ট উৎসুক ও আগ্রহী মানুষ) ।
এতো বড় ভূমিকা দেওয়ার কারন চিন্তাশীলতা ও বিবেক বোধ মাঝে মধ্যে বাধ্য করে কিছু বিষয়ে কিছু না কিছু বলতে( যেমন যথেষ্ট ঝুকি সত্বেও তরুন ডাক্তারদের আন্দোলন - প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তি নিয়ে একটি বড় লেখাই লিখে ফেলেছিলাম।ভাগ্যিস তা বরং যথেষ্ট পাঠক- প্রিয়তা পেয়েছিল।)
আবুবাকর নামে বাংলাদেশে একজন অতি জনপ্রিয় লেখক রয়েছেন অনেকের মতন আমি ও তা জানতাম না।যেমন এক সময় গায়িকা মমতাজ বা হিরো আলম বলে হিরো আছে তা ও জানতাম না।মমতাজ কিন্তু অগোচর থেকে শুধু গোচরে আসেনি,নিজ প্রতিভা বলে একটি বড় ও সম্মানজনক আসন পেয়ে গেছেন( অনেকে প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন,তা ভিন্ন মত থাকবেই)। হিরো আলম উৎকট নারসিসিজম এর   ক্যারিকেচার দেখিয়ে প্রচারে চলে আসলে ও খুব যে বড় অবস্হান দখল করে নিতে পেরেছেন বলা যাবে না( এখানে ও কেউ ভিন্ন মত দিতে পারেন যে না সে ভালো অবস্হানেই পৌছতে পেরেছেন)। কিন্তু সাম্প্রতিক আবুবকর নামক লেখক নিয়ে শেষ মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি।কিন্তু উনাকে নিয়ে কারো পক্ষপাতিত্ব আবার কারো চিত্ত- জ্বালা ও চিত্ত- বিনোদনের যে হিরিক পরেছে সেটি নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক বটে।

১। তিনি কোন মানের লেখক? তিনি কি রবীন্দ্রনাথ বা সেক্সিপয়র তুল্য? ১ম শ্রেনীর,২য় শ্রেনীর না.. ৩য়,৪র্থ  শ্রেনীর? শ্রেনী মাপার মানদণ্ড কি?বলবেন আমরা শ্রেনী বিবেচনা করিনি,তাহলে কোন বিবেচনায় তিনি হাস্যকর লেখক মনে হলেো?
নিসঙ্কোচে তিনি রবীন্দ্রনাথ তুলনীয় নয়,এমনকি ১ম শ্রেনীর ও নয়( হলে এতো বছরে বিশ্ব নন্দিত না হোক,দেশ নন্দিত হতেন।কেননা তিনি অনেক পুরনো লেখক, উনার বই প্রকাশ্যে  বহুল পঠিত ছিল কিন্তু সুধীজনের দৃষ্টি কাড়তে পারেননি।না পারার কারন তিনি স্বল্প শিক্ষিত বা মোল্লা টাইপের বা গ্রাম্য এরকম কোন শ্রেনী বিদ্বেষ নয়।মান সম্পন্ন লেখা বাজারে বের হলে এবং বহুল প্রচারিত হলে কয়েক মাস না হোক কয়েক বছরে তা কোন না কোন গুনী ব্যক্তির চোখে পরতো।আবার সম সাময়িক স্তরের চেয়ে অনেক উচ্চমাপের বলে বর্তমানে তিনি স্বীকৃতি পাচ্ছেন না( যেমনটি ঘটেছিল জীবনানন্দ এর বেলায়) ব্যাপারটি তেমন ভাবার ও কারন নেই( ছিদ্রান্বেষীরা  এখানে ও প্যাচ দিতে পারেন)। যারা উনাকে নিয়ে তুচ্ছ - তাচ্ছিল্য ও হাসি- তামাসা করছেন তারা নিশ্চয় উনাকে রবীন্দ্র তুল্য বা ১ম শ্রেনীর সাহিত্যিক ভেবে তা করছেন না।তারা নিজেদের উচ্চ- মার্গের  পাঠক না ভাবলে উনাকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করবেন কেন?।লক্ষ লক্ষ পাঠক- পাঠিকা যার( যেমনটি প্রচারিত হয়েছে) তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করা মানে , তার পাঠক পাঠিকার চেয়ে উনারা  নিজকে উচ্চ মার্গের পাঠক পাঠিকা ভাবছেন।( উচু মান নিয়ে হাসি তামাশা হয় না নিন্ম মান নিয়ে? এটিও ব্যাখ্যার দরকার আছে?)
২। তথাকথিত উচ্চ মানের লেখক ও পাঠক বনাম নিম্ন মানের লেখক ও পাঠক থাকলে এদের মধ্যে শ্রেনীভেদ ও আছে।তখন উচ্চ  ভাবা ব্যক্তিরা যদি নিম্ন মানের লেখক/ পাঠককে ব্যঙ্গ করে সেটিকে কি শ্রেনী- বিদ্বেষ বলা যাবে না?
৩। তারা আবার বলেন মান বা শ্রেনীর জন্য নয়,উনি ইসলাম ধর্মকে পুজি করে উপন্যাস লিখে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা করেছেন তাই উনার জাত- গোষ্ঠী উদ্ধার করা নাজায়েজ না।হুমায়ুন আহমেদ ওমুক করে,শরৎচন্দ্র তেমন করে বা ঐ লোক যৌনতা সম্বল করে বা তসলিমা পুরুষ বিদ্বেষ কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন- তা আপনাদের গা জ্বলবে কেন? আপনারাও পারলে তেমন কিছু ব্যবহার করে জনপ্রিয় হয়ে যান,কেউ মানা করছে?
৪। সবচেয়ে বড় অভিযোগ উনি বোরখা পড়ে প্রেম করা সহ  ধর্মীয় স্টাইলে প্রেম- যৌনতা করা যায় এই প্রলোভন দেখিয়ে মুসলিম তরুন তরুনীদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছেন যা পুরো ইসলাম পরিপন্হী ও ধর্ম অবমাননার সামিল।তারা বলেন শ্রে্নী বিদ্বেষ নয়,নিম্ন মান ও নয়, আমরা তার বিরুদ্ধে বলছি তিনি ইসলামী পন্হায় প্রেম যৌনতা করা যায় এমন না হক,  ইসলাম বিরোধী কাজ করেছেন।নাউজুবিল্লা বিবাহ পূর্ব প্রেম যৌনতাকে উনি জায়েজ করার চেষ্টা করেছেন।কত বড় নাফরমানি কাজ?।সাবাস,হাত তালি দিতে হয় এ সব ইসলাম প্রিয় ধার্মিক মানুষদের।ইসলাম ধর্মের এতো বড় অবমাননা কেমনে তারা সইবে? তাই উনারা এই বক ধার্মিক আবুবাকর এর বিরুদ্ধে জিহাদের অংশ হিসেবে এরকম সমালোচনা, বিদ্রূপ করছেন।তবে আফসোস হেফাজত বা জামাত বা আই এস সহ কেউ এই ইসলাম ধর্ম বেচে ও ইসলাম ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে প্রেম যৌনতার মতন অতি গরহিত বিধর্মী কাজের বিরুদ্ধে ঐ লোকের ফাসি চাওয়া দূরে থাক, তার বিপক্ষে একটি বাক্য ও ব্যয় করছে না।তাই বাধ্য হয়ে এই সেকুলার, অসাস্প্রদায়িক গোষ্ঠীকেই ইসলাম ধর্মকে অপব্যবহার থেকে রক্ষার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে।মহান আল্লাহ উনাদের এই ইসলামী জিহাদকে কবুল  করুন।সবাই বলুন - আমিন।
৫। উনাকে দেখে ও জেনে এটি বোঝা কঠিন নয় যে উনি সাধারন মানের একজন মুসলিম লেখক( কেননা উনি নাকি মুসলিম সংস্কৃতি ধারন করে উপন্যাস লিখেছেন)। ।দস্যু বনহুর এর লেখিকা বা আনোয়ারা উপন্যাস লেখক ও একটি শ্রেনীর   ও একটি নির্দিষ্ট বয়সের পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন( ৭ম-৮ ম শ্রেনীতে থাকাকালিন আমি ও রাত জেগে এ সব বই পড়েছি-) । আবুবাকার সম্ভবত সে মানেরই একজন লেখক,তবে অনেক বেশী জনপ্রিয়। লক্ষনীয় উনি নিজে নিজের প্রচারে কখনো নেমেছে বলে শুনিনি( যা আমরা অনেকেই আপ্রাণ চেষ্টা করি)। সাক্ষাতকারে ও আত্ম প্রচার বা আত্মরম্ভিতার কোন লক্ষণ ছিল না।সব ব্যাপারেই সাদা মাটা,সাধারন।ওনাকে কোন গোষ্ঠী বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রচারে নিয়ে এসেছে কিনা সে নিয়ে আরেকটি গোষ্ঠী উৎকন্ঠিত।এটি ঠিক এই প্রচারে উনার নাম খ্যাতি বেড়েছে এমনকি আপাত অনেকের কাছে অনেক বড় লেখক ও মনে হতে পারে।কিন্তু এতে উনার কোন হাত নেই।উনি আমাদের অনেকের মতন এতো বড় সুযোগকে কাজে লাগানোর ও কোন চেষ্টা করছেন না।তবে কেন বিদ্বেষ?  কেন হাসি তামাশা? ( তার লেখার মান বা বিষয় বস্তু নিয়ে সমালোচনা এক কথা,আর তাকে ক্লাউন বানিয়ে মশকারা করা ভিন্ন কথা।তাকেই ক্লাউন বানানো যায় যিনি কথায়,আচরনে এমন কিছু করেন যা বিরক্তিকর, আপত্তিকর ও অন্যের জন্য অপমানজনক। যেমন- ট্রাম্প,এরশাদ,হিরো আলম)।
যারা জ্বলে পুড়ে মরছেন এটি ভেবে এমন লেখক এতো বড় প্রচারনা কেন পাবে,কেন এতো বড় মাপের লেখক বলে দেশ বিদেশে প্রচার হবে,তাদের একটি ধ্যৈর্য্য ধরতে বলবো।সময়ের বিচারে  কোনটি স্বর্ন আর কোনটি নিছক পাথর তা নির্নিত হয়ে যাবে।আবুবাকার আবুবাকারই থাকবেন। তাকে কেউ উচ্চে বা কেউ নিম্মে নিয়ে যেতে পারবেন না( তাহলে এরশাদ সাহেব নিজ প্রচারেই মহান কবি হিসেবে ইতিহাসে নাম লিখে যেতে পারতেন)।
৬। কেন জনপ্রিয়?  আমার নিজের বিবেচনায়( অনেকে একমত নাও হতে পারেন) উনি জনগোষ্ঠীর একটি বৃহত অংশের ধর্মিয়- মনস্বতাত্বিক পাঠটি ভালো ভাবে করতে পেরেছেন অথবা নিজ  ধর্মীয় - সাংস্কৃতিক চেতনার রং মিশিয়ে সাহিত্য লিখতে গিয়ে নিজের অজান্তেই সে জনগোষ্ঠীর নজরে পড়ে গেছেন।কৈশোর - তারুন্যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ভালো লাগা,আকর্ষন বোধ করা,প্রেমে পড়া এবং সাবলাইম পদ্ধতিতে হলেও যৌন কামনা চরিতার্থ করা একটি " বায়োলজিক্যাল ডিমান্ড"। ধর্মীয়- সামাজিক - পারিবারিক বাধার কারনে অনেকেই আবেগের সে চাহিদাকে হয় এড়িয়ে যায়,অস্বীকার করে বা বিকৃত পথে চলে যায়।কিন্তু যদি এমন পন্হা কেউ খুজে দিতে পারে যাতে ঐ ধর্মপ্রান ছেলে- মেয়েগুলো ভাবতে পারে,বিশ্বাস করতে পারে যে সে/ তারা শরীর- মনের চাহিদা যে প্রেম তা  করতে পারছে অথচ এতে তার " পাপ" হচ্ছে না।সে নৈতিকভাবে,ধর্মীয়ভাবে সঠিক থেকেও প্রেম- ভালোবাসা করতে পারছে- এর চেয়ে মহৎ মুক্তি তাদের জন্য আর কি হতে পারে।আমরা সবাই নিজের লোভ- লালসা- কামনা চরিতার্থ করতে চাই,বাধা কেবল ধর্মীয়,নৈতিক অনুশাসন।যে পদ্ধতিতে বিবেকের অনুশোচনা ছাড়াই প্রেম,যৌনতা করা যায় তা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বিশেষ করে মুসলিম তরুন-তরুনীর জন্য  বিরাট আশীর্বাদ তুল্য।আবুবাকার কি সেই গরিষ্ঠ মানুষদের তেমন মুক্তির আনন্দ দিতে পেরেছেন?তার জনপ্রিয়তার এটিই বড় কারন বলে আমার ব্যক্তিগত মতামত( তবে এটি কোনভাবেই প্রকৃত ইসলাম সমর্থন করে না।বিবাহ পূর্ব বা বিবাহ বহির্ভূত কোন প্রেম ভালোবাসা ইসলাম সম্মত নয়।সেদিক থেকে তাকে প্রচন্ড বিরোধীতা করা  যায়।ডবে সেটি তো করবে মাওলানা- মৌলভীরা।যারা সারাক্ষণ ধর্মীয় গোড়ামীর বিরোধীতা করে আসছেন,নিজেদের আধুনিক,অসাম্প্রদায়িক বলে গলা ফাটিয়ে ফেলছেন তারা যদি আবুবাকার ইসলাম বিরোধী কাজ করছে বলে ক্ষিপ্ত হয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রপ করতে থাকেন তখন প্রশ্ন জাগে- ঢাল মে কুস ক্যালা হ্যায়।)
মানব- মানবীর প্রেম নিয়েই জনপ্রিয় উপন্যাস হয়।সেটি ধর্মমনা মানুষের জন্য সহজ করার ( ইসলাম বিরোধী)  সস্তা পথ ধরার জন্য আবুবাকারকে কাঠগোড়ায় কেউ দাড় করাতেই পারেন।কিন্তু তাকে তাচ্ছিল্য বা হেয় করে মজা নেওয়ার প্রবনতা বিকৃতির সামিল