ইতিবাচক থাকা মানে এই নয় যে সব কিছু ওকে থাকবে
বরং ইতিবাচক থাকা মানে,
যা-ই ঘটুক আমি ওকে থাকবো
Wednesday, April 24, 2019
সাইকোলজিক্যাল টিপস -৫৮ঃ
Sunday, April 14, 2019
সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল --৪৫-ঃনুসরাত,আ্যাসান্জ ও কৃষ্ণ গহ্বর
"অবিচার দেখে ও তার প্রতিবাদ না করতে করতে, আমরা নিজেদের চেতনাকে সেই অবিচারের প্রতি অসাড় হয়ে উঠার প্রশিক্ষণ দেই।এবং ধীরে ধীরে নিজেদের ও আপনজনদের রক্ষা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি।"
জনগণের গোয়েন্দা, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান আ্যাসান্জ এর এই উক্তি, আমাদের সমাজের জন্য পুরোপুরি সত্য।
প্রতিদিন রাস্ট্রীয়,সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক নানান রকমের অন্যায়, অবিচার হতে আমরা দেখি।আমরা কতজন সেগুলোর প্রতিবাদ করি?
রাস্তা ঘাটে, বাস-ট্রেনে শত শত অবিচার ঘটে যায়। আমরা "ভদ্রলোকরা" মান সম্মানের ভয়ে বা "কি হবে প্রতিবাদ করে " মনে করে বা "এটি দেখার দায়িত্ব আমার না" মনে করে, চোখ বুঝে সেগুলো উপেক্ষা করে যাই।
এভাবে অন্যায়,অবিচারের প্রতি আমাদের চেতনা বোধ অসাড় হয়ে পড়েছে।এসব এখন গা-সয়া হয়ে গেছে।
এজন্য অপশক্তি আরো বেপরোয়া ভাবে, প্রকাশ্যে নিজেদের অপকর্ম করার উৎসাহ পাচ্ছে।
আমাদের সমাজ আপোষকামীতা,তোষামোদি,সমঝোতা, অন্ধ আনুগত্য, সুবিধাবাদিতাকে গ্রহনযোগ্য, উচ্চ "সামাজিক গুন" মনে করে পুরস্কৃত করে।
শুধু তাই নয় একে "বুদ্ধিমানের কৌশল" বলে অন্যদের এরকম হতে উৎসাহিত করে।
আর যারা এরকম বিরূপ পরিস্থিতিতে ও সাহস করে প্রতিবাদ করে, তাদেরকে গোয়ার,, নির্বোধ, বে-খাপ্পা,অসামাজিক ইত্যাদি ভাষায় অভিহিত করে।
তবে এর কিছু ব্যতিক্রম আছে। নুসরাত সে ব্যতিক্রম। সে ও তার পরিবার আপোষ করলে, তথাকথিত সমঝোতা করলে বা কৌশলী হয়ে অনুগত থাকলে, তাকে এভাবে পুড়ে মরতে হতো না।
বরং হুজুরের বদান্যতায় প্রশ্ন পত্র পেয়ে ভালো রেজাল্ট করতো, ভবিষ্যতে আরো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ উপহার পেতো।
নুসরাত ও আ্যাসান্জের মধ্যে মিলটি হচ্ছে তারা ব্যক্তি হিসেবে নগন্য, ক্ষুদ্র হলেও, প্রতিবাদ করেছে শক্তিমানদের বিরুদ্ধে।
এরকম করতে গিয়ে তারা নিজের নিরাপত্তা, স্বার্থেের কথা একবার ও ভাবেনি।
চেতনায় অসাড় সমাজে নুসরাত বাংলাদেশের মালালা,আরেক বিপ্লবী প্রীতিলতা।
আমাদের দেশ এককেন্দ্রিক শাসিত । কিন্তু স্হানীয় পর্যায়ে এমনকি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে, আমরা একেকটি "মোঘল সাম্রাজ্য " তৈরি করে রেখেছি।
এখানে একেকটি গোষ্ঠী স্হানীয় সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে।স্হানীয় রাজনীবিদ,সমাজ-নেতা,জনপ্রতিনিধি, আইনশৃংখলা বাহিনী ও অন্যান্য শক্তি মিলে একটি নিজস্ব "বলয়" তৈরি করে রাখে।
এই ক্ষমতা বলয়ের চারপাশে ঘিরে থাকে, একদল সুবিধা ভোগী মাস্তান চক্র।
নুর উদ্দীন, শামিমরা হচ্ছে সেই লাঠিয়াল বাহিনী।
অন্যদিকে বাকি সব আমজনতা "ভয়ে বা লোভে" এই বলয়ের অন্ধ আনুগত্য করে, তোষামোদি বা চামচামি করে থাকে।
যেসব শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রী অধ্যক্ষ রক্ষায় মিছিল ও আন্দোলন করেছে, এরা হচ্ছে সেই তোষামোদকারী, অন্ধ অনুগত বাহিনী।
এই চিত্র শুধু সোনাগাজীর নয়,এটি সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র।
ভালো মানুষ, সৎ,মানবিক, মেধাবী মানুষদের এখন কোন সামাজিক কদর,সম্মান নেই। বিভিন্ন স্তরে বিরাজমান সামাজিক, রাস্ট্রীয়,প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কেন্দ্র গুলো নিয়ন্ত্রিত হয়, ঐ রকম গোষ্ঠী গত অপশক্তি দ্বারা।
সেখানে মেধাবী, মানবিক মানুষরা থাকে অপাংক্তেয় হয়ে।
তাদেরকে কোনঠাসা করে, হেয়,নীচ করে রাখা হয়।ফলে সাধারণ মানুষ তাদেরকে অনুসরণ করবে দূরে থাক, তাদেরকে করুনা করে, তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে।
প্রতিটি হত্যা, ধর্ষণের আলাদা আলাদা কার্যকারণ থাকে। তবে এদের মধ্যে কমন কিছু ফ্যাক্টর ও থাকে।
নুসরাতকে যৌন হেনস্তা করা ও পরবর্তীতে প্রতিশোধ হিসেবে আগুনে পুড়িয়ে মারার ক্ষেত্রে, কয়েকটি বিষয় বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রথমতঃপূর্বে বর্নিত সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, পুলিশী ছত্রছায়ায় যে শক্তির নেক্সাস তৈরি হয়ে রয়েছে, সে ক্ষমতা বলয়ের কারো অপকর্ম,অনাচারকে অবনত মস্তকে মেনে না নিয়ে, তাকে/তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করা, প্রতিবাদ করার অনিবার্য খেসারত হচ্ছে এরকম পরিনতি।
ঐ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আপোষ না করে "সম্মানিত হুজুরকে" কারাগারে নেওয়াকে ঐ অধ্যক্ষের অন্ধ অনুগত দাসগুলো "অমার্জনীয় অপরাধ" হিসেবে গন্য করেছে। তারা আরও মনে করেছে এর মাধ্যমে সমগ্র আলেম সমাজকে হেয় করা হয়েছে। তাই নুসরাতকে সর্বোচ্চ শাস্তি পেতে হবে।
অন্য দিকে ঐ মাদ্রাসার কিছু শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রী, যাদের রয়েছে ক্ষমতাবান হুজুরের প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও দায়, তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে "পরম শ্রদ্ধেয়" হুজুরের অসম্মানে ও তাদের গর্বের, গৌরবের প্রতিষ্ঠানের (মাদ্রাসার) "ভাবমূর্তি " ক্ষুন্ন হওয়ার কারনে।
এই ব্যক্তি পূজা ও প্রতিষ্ঠান পূজার উদাহরণ কিন্তু সর্বত্র। সম্প্রতি কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ও ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠে।
ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলনের চাপে ও মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার কারনে, ভার্সিটির কতৃপক্ষ তাদেরকে সাময়িক বরখাস্ত ও নামকাওয়াস্তে তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তবে কর্তৃপক্ষ এবং তাদের কিছু সহকর্মী তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত "ভাবমূর্তি " রক্ষায় নানান রকমের ছলচাতুরী, বাহানার আশ্রয় ও নিয়ে থাকে। তাদের কাছে ও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা মূখ্য বিষয় হয়ে দাড়ায়।
অথচ এরকম অপকর্মই যে ভাবমূর্তি হারানোর মূল কারণ এবং এর যথাযথ শাস্তি প্রদানই যে, সে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ, এই উচ্চ শিক্ষিত মানুষ গুলো ও সেটি ভুলে যায়।
২য়ত শামীম নামক ছেলেটি নুসরাতকে বার বার প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়।অথচ সে স্হানীয় ভাবে শক্তিশালী।
নুরউদ্দীন,শামিমরা হচ্ছে ঐ অধ্যক্ষের লাঠিয়াল বাহিনী। এর আগে ও প্রত্যাখ্যানের জন্য নুসরাতকে অপদস্ত করা হয়েছিল। তাকে চুনকালি মেখে আহত করে। এতে তাকে হাসপাতালে পর্যন্ত ভর্তি হতে হয়।
ঐসব অপরাধ করে ও তারা ঐ খুটির জোরে পার পেয়ে যায়।অপরাধের শাস্তি না হওয়াতে এরা আরো উদ্ধত, বেপরোয়া হয়ে উঠে।
শামীম এবার তার প্রেম প্রত্যাখ্যানের শোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।গোপন মিটিংয়ে নুসরাতকে কিভাবে মারবে তার পথ বাতলাতে শামীমই প্রস্তাব করে, আগুনে পুড়িয়ে মারার কথা।
জিঘাংসা কতো নির্মম, কুৎসিত হলে মানুষ এতো জগন্য প্রস্তাব করতে পারে?
৩য়ত ঐ হুজুরের বিরুদ্ধে আগে ও এরকম অনেক অনৈতিক, অপরাধের অভিযোগ ছিল। যারা প্রতিবাদ করেছে বরং তাদেরকে সে শোকজ নোটিশ পাঠায়।
স্হানীয় পর্ষদ, পুলিশ কেউ ঐসব অপরাধের বিচারে ভূমিকা নেয়নি। এভাবে বিচারহীনতার কারনে অপরাধ প্রবনতা বৃদ্ধি পায়।হুজুর ও নিজেকে সবকিছুর ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করেছে।
তানাহলে সে এতো উদ্ধত হয়ে নুরউদ্দীনকে বলতো না তোরা আমার জন্য কি করলি?। এর মাধ্যমে সে তার মাস্তান বাহিনীকে একশনে যেতে ইঙ্গিত দেয়।
এর পরিনতি কি হবে তা ভাবেনি।বরং ভেবেছে আগের মতনই সব ম্যানেজ করে ফেলবে।
৪র্থ বিষয়টি হচ্ছে সব অপরাধের মূল কারণ।
মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে
১। ব্যক্তিত্বের আদিম স্তর "ইদ" (id) কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে।
সকল লোভ,লালসা,কামনা বাসনা তাৎক্ষনিক ও যেকোন উপায়ে চরিতার্থ করতে চায় ইদ।ইদের চাহিদা যাদের বেশি, তারা অপরাধে জড়িয়ে পরে সহজে।
ছোট কালে পরিবার থেকে সুশিক্ষা পেলে, ইদের লাগামহীন চাহিদার মাত্রা কমে আছে। কিন্তু কয়টি পরিবারে সে সংযম,ধৈর্য শিক্ষার পরিবেশ রয়েছে ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তি মেটানোর দাবীকে অগ্রাহ্য করার শিক্ষা দেওয়া হয়?
২। ইগো-যদি দুর্বল হয় তাহলেও মানুষ অপরাধ প্রবন হবে।
ইগোর কাজ হচ্ছে ইদের অনৈতিক চাহিদাকে বাস্তব সম্মত করা বা নিয়ন্ত্রণে রাখা। ইগো দুর্বল হলে তাই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পরে।
ইগো নিয়ন্ত্রণে থাকে আইনের ভয়ে, সমাজের ভয়ে বা ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে।
কিন্তু আইনের শাসন, সুবিচার কিংবা সামাজিক ন্যায্যতা কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? ।
৩। সুপার ইগো বা বিবেকঃ বিবেক ভালো ভাবে গড়ে না উঠলে বা পরবর্তীতে বিবেক মরে গেলে, মানুষ আর মানুষ থাকে না।তখন সে দানবের মতন,পশুর মতন পাপ কার্য করে বেড়ায়।
প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের নৈতিকতা, মূল্যবোধের অবস্থান কোথায়? সার্বিকভাবে দেশে,সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে এটি এখন কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে যারা নৈতিকতা শেখাবেন তারা নিজেরাই নৈতিক অধপতনের চূড়ান্ত সীমায়।
কোথায় নৈতিকতা শিখবেন?
পরিবারে? আমরা কি নিজেরা তেমন উত্তম "রোল মডেল "?
শিক্ষালয়ে? যেখানে উপরের নির্দেশে পাশের হার ও জিপিএ -৫ এর হার গনহারে বাড়িয়ে দেয় শিক্ষকরা-সেখান থেকে?
সর্বশেষ আশ্রয় স্হল হলো ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান। মাদ্রাসা যাকে আমরা নিছক প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাবি না,যাকে ভাবা হয় নৈতিকতা ও আদর্শবাদিতা শেখার মূল কেন্দ্র, সেখানে ও ঘটছে অবিশ্বাস্য কিছু ঘটনা (সব মাদ্রাসা বা হুজুরকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা ঠিক না)।
যে হুজুর তার ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে অন্যায়,অপকর্ম থেকে বিরত থাকার নৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শের বীজ রোপণ করবেন, সে কি করে পরীক্ষার প্রশ্ন পত্র পাইয়ে দেওয়ার মতন অনৈতিক প্রস্তাব করতে পারেন?
তদুপরি তিনি সেটি স্নেহবশত করলে ও অনৈতিক হতো, কিন্তু তিনি সেটি করেছেন অত্যন্ত জগন্য একটি পাপাচারের প্রস্তাব দিয়ে।
ইসলাম ধর্মে এরকম গর্হিত পাপাচারের শাস্তি কত ভয়ঙ্কর, মাদ্রাসার আলেম হিসেবে ওনার এটি ভালো জানার কথা।
৫মত পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সবাই প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশ শুধু উর্ধতনদের আদেশ পালন করে তা নয়,স্হানীয় পর্যায়ে যে নেক্সাস, এর অন্যতম অনুঘটক থাকে কিছু সংখ্যক পুলিশ।
ক্ষমতাশালী নেতৃত্ব যে বলয় তৈরি করে, তাদের ইচ্ছে পূরনে তারা বাধ্য থাকে বা নিজ স্বার্থে একজোট হয়ে কাজ করে।
সার্বিক ভাবে বললে নৈতিক, মানবিক সমাজ নির্মাণে আমাদের ব্যর্থতা এবং রাস্ট্রীয় ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি
একটি নষ্ট, পচনশীল, অধপতিত পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
আমাদের সমাজ ক্রমশ সেই অন্ধকার, পিচ্ছিল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।
মহাবিশ্বে কৃষ্ণ গহ্বর যেমন সবকিছু গ্রাস করে নেয়, এমনকি আলো পর্যন্ত সেখান থেকে ফিরে আসতে পারে না। তেমনি আমরা ও মনে হচ্ছে তেমন এক রাহুগ্রাসের কবলে পড়ে, ক্রমশ কৃষ্ণ গহ্বরে চিরতরে তলিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছি।
এই অধপতন ও তলিয়ে যাওয়া রোধ করার কোন উপায় কি নেই? কারা ঠেকাবে কৃষ্ণ গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার তীব্র পিছু টানকে?
Friday, March 29, 2019
সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল -৪৩ঃএরাই বাংলাদেশ, এটাই বাংলাদেশ
বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগার পর আমাদের জাতিগত কিছু প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য যেমন দেখতে পেয়েছি,
তেমনি কিছু অতি সুশীল, অতি আতেলদের কিছু উৎকট,উন্নাসিক বৈশিষ্ট্য ও প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
১। এদেশের কিছু সুশীলদের বেশ কিছু আপ্তবাক্য রয়েছে যেগুলো আবার বেশ জনপ্রিয় ও।
ক)পথচারীদের আইন না মানা দুর্ঘটনার অন্যতম কারন -মুর্খ বাঙ্গালী মরবে না কেন?
খ)ফুটওভার ব্রীজ দেওয়া আছে, অলস বাঙালী সেটি ব্যবহার করবে না, দৌড়ে রাস্তা পার হবে
-বাসের চাকার নীচে তোরা মারা পড়বি না তো, আমাদের মতন আইন মানা,সুনাগরিক মারা পড়বে?
কখনো দেখেছিস আমরা গাড়ির চাপায় পড়েছি?
যদি বলা হয় উন্নত দেশে রাস্তায় চলাচলে পথচারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়,
ফুটওভার ব্রিজ থাকে কদাচিত,
নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে একযোগে পথচারী স্বচ্ছন্দে রাস্তা পার হয়-
তখন তারা বলে এটি বাংলাদেশ, উন্নত দশ নয়
।বৃদ্ধ, পঙ্গু, অসুস্থরা কেমনে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করবে?
আরে ভাই তারা গাড়ীতে করে যাবে, পথে হাটবে কেন?আর গাড়ি না থাকলে ঘরে বসে থাকবে বাইরে বের হওয়ার এতো শখ কেন?
গ)ছোটলোক হকারদের জন্য শান্তি মতন রাস্তা দিয়ে ও হাটতে পারি না।
আমরা সবদিক থেকে এতো নিশ্চিত সুখী নিরাপদ ও আরামে জীবন যাপন করছি, শুধু এই নচ্চারদের ফুটপাত দখলের কারনে জীবন তেনা তেনা হয়ে গেল।
নাগরিক জীবনে একমাত্র ও প্রধান সমস্যা হচ্ছে হেলেদুলে ফুটপাতে হাটতে না পারা।
হাটতে গেলেই ঐসব নোংরা, অপরিচ্ছন্ন গেয়ো লোকগুলোর সঙ্গে ধাক্কা লাগে। দুরুত বাসায় গিয়ে স্নান করে আবার পবিত্র হতে হয়।
পুলিশগুলো সব ঘুষখোর, একদিন পিটায় তো পরদিন খবর রাখে না।
হকারদের জন্য রাস্তায় দুর্ঘটনার হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে । ওখানে যে ফকির মিশকিনরা কেনাকাটা করে, এরা রাজধানীর আভিজাত্য নষ্ট করছে।
কমদামে জিনিস কিনবি তো গ্রামে যা। শহরে থাকবি ফুটানি দেখাতে, তাহলে বসুন্ধরা যা কেনাকাটা করতে
ঘ)আগুন লেগেছে, বিল্ডিং ধ্বসে পড়েছে , এখন এসব উদ্ধার করবে সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
এরা কি আগে দক্ষতার সহিত এগুলো করে দেখায়নি?
তোমরা আমজনতা বেয়াক্কেলের মতন হা করে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে কি কচুটা করেছো?
মাঝখানে তোমাদের জটলার কারনে আমাদের চৌকস বাহিনী গুলো এতো এতো আধুনিক সরঞ্জাম গুলো ব্যবহার করতে পারলো না।
পুলিশ গুলো তাদের পাছায় আগুন লাগিয়ে দিলো না কেন?
বেতমিজ পাবলিককে এভাবে রাস্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাধা দেওয়ার জন্য গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো উচিত ছিল।
ঙ)আমরা ও তোঐ জায়গার পাশ দিয়ে গেলাম। এক মুহূর্ত ও দাড়ায়নি,নিজের কাজে চলে গেছি।
তোমাদের মতন আমরা বেকার ও না,দায়িত্বহীনও না।
আমরা নিজ নিজ অফিসে গিয়ে গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে দেশ সমাজের কাজ করেছি,
সন্তানদের স্কুল থেকে আনতে গেছি,
বাজার করতে গেছি,
সেমিনারে এটেন্ড করেছি -
ইত্যাদি নিজ নিজ কাজ করেছি।
আর তোমরা হা-ভাতে লোকেরা কাজকাম নেই, ঘন্টার পর ঘন্টা ওখানে দাঁড়িয়ে হাসি তামাশা করলে।
এতো র্হদয় বিধারক ঘটনায় কোথায় শোকে,কান্নায় আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করবে, না,মনের সুখে ঘটনার ছবি উঠাও,সেলফি তোলো।
ছিঃতোমাদের ঘৃন্য মানসিকতার। এরকম সময়ে কেউ ছবি উঠাতে পারে?
তোমরা কি সাংবাদিক যে ঘটনার রেকর্ড রাখতে ছবি উঠাবে?
তোমাদের না আছে বিবেক,না আছে কাণ্ডজ্ঞান, না আছে সিভিক সেন্স।
দেখো না আমরা ঐখানে কি ঘটছে, মানুষ মরছে না পুড়ছে সেগুলো নিয়ে ভেবে নিজের কাজকর্ম বাদ দেইনি।
মরা,পোড়া দেখা বা সেগুলো প্রতিরোধ করার জন্য নির্দিষ্ট সংস্থা আছে। এগুলো তাদের কাজ।
তোমরা বরং এদের কাজে বাধা দিয়ে গুরুতর অপরাধ করেছো।
কবে শিখবে সিভিক সেন্স, নিজ কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা অর্জন করবে ?
দরদ দেখিয়ে থেকে গেলে?তাহলে মজা করে ছবি উঠালে কেন? লজ্জা লাগলো না?
চ) লসএন্জেল এর মতন রূপসী ঢাকার সৌন্দর্য, আভিজাত্য ও গরিমা নষ্ট হচ্ছে কিছু গ্রাম থেকে উঠে আসা হতদরিদ্রের বস্তিগুলো।
বিদেশীদের কাছে এদের জন্য মুখ দেখাতে পারি না।
আর সকল অপরাধের আখড়া হচ্ছে এগুলো।
আমরা ঘুষ খেতে পারি,ব্যাংক, অফিস লুটপাট করতে পারি, জঙ্গি সন্ত্রাসী লালন করতে পারি। তবে সেগুলোর একটা ক্লাস আছে।
নোংরা বস্তির ছিটকে চোর ছ্যাচর লালন করি না। সরকারের উচিত বুলডোজার দিয়ে বস্তিগুলো গুড়িয়ে দেওয়া। অথচ সরকার আমাদের বড় বড় বিল্ডিং
ভাঙ্গছে, দেশের সম্পদ নষ্ট করছে।
আমরা না থাকলে ঐ ছোটলোকদের নিয়ে রাস্ট্র চালাতে পারবে? দুদিনে গনেশ উল্টে ফেলবো না।
২।এর বিপরীত চিত্র ও দেখেছি। যা ছিল আশার আলো।
দেশের সকল দুর্যোগে যেসব অকুতোভয়, আত্মত্যাগী মানুষেরা সবসময় এগিয়ে আসে,
নিজের, পরিবারের কথা ভুলে গিয়ে জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কাজে ঝাপিয়ে পড়ে,
তেমন হাজার হাজার লোক সেখানে ভীড় করেছিল।তারা তামাশা করতে সেখানে ভীড় করেনি।
সুযোগ থাকলে তারা রানাপ্লাজার মতনই দুঃসাহসিক কাজের উদাহরণ রাখতো।তারপর ও দুএকজন সেরকম দৃষ্টান্ত রেখেছে। সবাই ভদ্রলোকদের মতন যার যার পথ ধরলে নাইমের মতন শিশু আমরা পেতাম কি?
আমাদের গর্বের উৎস ফায়ার সার্ভিস ওসিভিল ডিফেন্ডের যোদ্ধারা। যে দক্ষতা, নিষ্ঠা,দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের নজির রেখেছে জাতি চিরদিন সশ্রদ্ধ চিত্তে তা মনে রাখবে।
এরাই বাংলাদেশ, এটাই বাংলাদেশ
Monday, March 25, 2019
সাইকোলজিক্যাল টিপস -৫৭ঃফাদে আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ কি রূপ নেয়, কেন এগুলো চেপে রাখি?
আবেগীয় মালপত্র নিছক স্মৃতি মাত্র নয়।এগুলো হচ্ছে নেতিবাচক শক্তি, যা আপনার শরীরের বিভিন্ন অংশের অলিগলির গোপন ফাঁদে আটকে পড়েছে।
মনে রাখবেন বিশ্বের সবকিছুই শক্তি। বস্তু শক্তি, চিন্তা শক্তি, আবেগ শক্তি আর শরীর তো শক্তিই।আমাদের দেহ হচ্ছে এক সেট শক্তির জটিল সমাবেশ।
ঐ আটকে পড়া নেতিবাচক শক্তি আমাদের দেহের স্বাভাবিক শক্তি ও কাজকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে ব্যথা উৎপন্ন হয়,দেহে নানা সমস্যা ও রোগের সৃষ্টি হয়।
আমরা অনেকেই জীবনের অপ্রিয়, কষ্টদায়ক, পীড়াদায়ক, বিব্রতকর, অপমানকর অভিজ্ঞতা চেপে রাখি।
এ-সব পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে থাকে রাগ,ক্রোধ, তিক্ততা, বিরক্তি, ক্ষুব্ধতা,হতাশা, ব্যর্থতা, ভয় ভীতি, দুঃখ কষ্ট, শোক, লজ্জা অপমান, অযোগ্যতা,দুর্বলতা প্রভৃতি অনুভূতি।
কেন তিক্ত অভিজ্ঞতা চেপে রাখি?
আমরা এসব চেপে যেতে চাই, কেননা আমরা ঐরকম তীব্র নেতিবাচক আবেগ অনুভূতি থেকে মুক্ত থাকতে চাই।
কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না, ঐ পীড়াদায়ক আবেগ গভীর ভাবে অনুভব না করে, কোনভাবে মনের গহীনে ঠেলে ঠুলে দিয়ে, ফাঁদে আটকে রাখলে ও, ঐসবের হাত থেকে আমাদের মুক্তি নাই।
যে কষ্ট, যন্ত্রণা, অপমান, লান্চনা, হতাশার অনুভূতি আপনি গভীর ভাবে, তীব্র ভাবে অনুভব করেননি,সেগুলো থেকে নেতিবাচক শক্তি নিঃসরণ হয় না।
ফলে অনুভূতির থলিতে যে "বিষ" জমা, তা বের হতে পারলো না।
যখনই আবেগ অনুভূতি তীব্রভাবে, গভীর ভাবে অনুভব করবেন, তার মানে সেসব থলিকে ভালো ভাবে চেপে, এর মধ্যেকার বিষ বা নেতিবাচক শক্তি নিঃসরণ করে ফেললেন।
এখন সেগুলো স্মৃতি হিসেবে থাকলেও আপনার কোন ক্ষতি নেই। আমাদের জীবনের সকল অভিজ্ঞতাই স্মৃতি হিসেবে থাকবে। স্মৃতি হচ্ছে ঐ ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ রেকর্ড মাত্র।
ঐ ঘটনার কিরকম ব্যাখ্যা আপনি করেন, তার উপর নির্ভর করে সেগুলো নেতিবাচক শক্তি বা চার্জ বহন করবে কিনা।
আবার অনেকে মনে করেন, নেতিবাচক আবেগ মন্দ জিনিস।
তাই তারা এগুলো চেপে যায়।
যেমন অনেকে মনে করেন রাগ প্রকাশ মন্দ কাজ।তাই তারা রাগ চেপে রাখেন।
কিন্তু "বোতল বন্ধি" আবেগ, সময় মত তার আসল রূপে ফিরে আসে।
তাহলে কিভাবে আবেগকে "নির্বিষ" করবেন, ফাঁদে আটকে পড়া থেকে বাচাবেন?
(৩য় ও শেষ পর্ব-আগামীকাল)
Saturday, March 23, 2019
সাইকোলজিক্যাল টিপস -৫৬ঃঅবচেতনের ফাঁদে আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ ও এসবের কুফল
(সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে এতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে আমার মূল যে কাজ, সাইকোলজিক্যাল টিপস -বহুদিন হলো তা দিতে পারিনি। এ জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত)
ফাঁদে আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগকে "আবেগের মালপত্র " ও বলা যায়।আমরা অনেকে মনে করি এসব আবেগীয় মালপত্র হচ্ছে, জীবনে আবেগীয় ভাবে আঘাত গুলোর স্মৃতি মাত্র। কিন্তু এগুলো এরচেয়ে বেশি কিছু।
কেননা এগুলো খুব ধীরে ধীরে (স্লো পয়জনিং এর মতন), গোপনে, আমাদের অজান্তে আমাদের শরীর ও মনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে।
আমাদের প্রত্যেকের কিছু না কিছু বেদনাদায়ক ও পীড়াদায়ক জীবন অভিজ্ঞতার স্মৃতি রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগ অবচেতন মনের ফাঁদে আটকে পড়ে।
আমরা তখন এগুলো নিয়ে সচেতন থাকি না।অথচ এগুলো আমাদের স্বাস্থ্য, সম্পর্ক,সুখ, সফলতা সহ বহু ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের প্রকৃত সফলতা, ইচ্ছা ও প্রাচুর্যকে নিজেরাই সাবোটাইজ করে রাখি।
তবে শুভ সংবাদ হচ্ছে এই আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ আমরা অবমুক্ত করতে পারি ও এভাবে এর ক্ষতিকর প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারি।
কি রকম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে?
আমাদের দৈহিক প্রায় সকল সমস্যা ও রোগের পিছনে মূল কারণ বা সহযোগী কারণ হচ্ছে অবচেতনে আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ। ফলে শারীরিক সমস্যা, রোগ বা ব্যথা সবই হতে পারে।
এছাড়া সম্পর্কে জটিলতা, কর্মক্ষেত্রে অক্ষমতা ও জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে।আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ ও স্মৃতি একইরকম ঘটনাকে ঢেকে আনতে পারে।
এই আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ কিন্তু হারিয়ে যায় না। এগুলো অবচেতনে সক্রিয় থাকে, সুপ্ত শক্তি হিসেবে থাকে। এগুলো নীরবে আমাদের সফলতার পথ রুদ্ধ করে রাখে।
আরো মনে রাখতে হবে যদি এই আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ নিঃসরন করতে না পারি, জীবন জগতের উত্তরনের যে অগ্রযাত্রা, আমরা এই পথের শরিক হতে পারবো না।
পৃথিবীর শক্তির ফ্রিকোয়েন্সী বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে আমাদের দেহ ও সচেতনতার ফ্রিকোয়েন্সী ও।ক্রমশ আমরা আমাদের উচ্চতর সত্তাকে জাগ্রত করতে পারছি, মানুষের সচেতনতার স্তর উর্ধ থেকে উর্ধমুখী হচ্ছে।
কিন্তু এই উর্ধমুখী উত্তরন থেকে আমাদেরকে পিছনে টেনে রাখে এই আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ। যেহেতু সবকিছুর ফ্রিকোয়েন্সী বাড়ছে, তাই আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগের শক্তি এবং ফ্রিকোয়েন্সী ও বাড়ছে। ফলে এদের ক্ষতিকর প্রভাব ও বাড়ছে।
তাই এসব ফাঁদে আটকে পড়া নেতিবাচক আবেগ নিঃসরন করা জরুরি । কিন্তু কিভাবে?
(পর্ব-২ঃ আগামীকাল)
Wednesday, March 20, 2019
সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল -৪২ঃজগতের সকল প্রাণী সুখী হোক/সুখী মানুষরা একত্রে থাকে
প্রতি বছর ২০ মার্চ "বিশ্ব সুখ দিবস " পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে "সুখী মানুষরা একত্রে থাকে " (হ্যাপিয়ার-টুগেদার)। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের মধ্যে কিছু কমন বৈশিষ্ট্য ও উত্তারাধিকার রয়েছে। এই প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য হচ্ছে, আপনি মানব জাতির যে বিভেদ, বিদ্বেষ সেটিকে উসকে না দিয়ে, মানুষে মানুষে দূরত্ব সৃষ্টি না করে, আমরা যেন মানব জাতির কমন বৈশিষ্ট্য, প্রয়োজন ও প্রবনতার দিকে বেশি মনোযোগ দেই।
যে জাতিগত ও ধর্মীয় উগ্রবাদ আমাদের বিচ্ছিন্নতা, বিভক্তি বাড়াচ্ছে, তার বিপরীতে আমাদেরকে একত্রে থাকতে হবে, একসঙ্গে থাকতে হবে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চের বিয়োগান্তক ঘটনার পর সে দেশের প্রধানমন্ত্রী, সরকার ও জনগণ যেভাবে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা,সংহতি প্রকাশের যে অনন্য নজির স্হাপন করেছেন, তা অন্যদের জন্য একটি বড় উদাহরণ হতে পারে।
আমরা বিভক্ত সমাজ চাই না, একত্রিত মানব জাতি চাই। আর একসঙ্গে থাকা মানুষরাই সুখী মানুষ। বিচ্ছিন্ন, অন্ধকারে ঘাপটিমেরে থাকা সন্ত্রাসীরা কখনো সুখী মানুষ হতে পারে না।
২০১২ সনে জাতিসংঘের স্পেশাল এডভাইজার জেয়মি ইলিয়েন(jayme Illien) বিশ্ব সুখ বৃদ্ধি, একত্র করা ও উন্নয়নের জন্য ২০ মার্চ বিশ্ব সুখ দিবস পালনের প্রস্তাব করেন।বিশ্বের ১৯৩টি দেশ ২০১২ সনের ২৪ জুলাই এই প্রস্তাব রেজুলেশন ৬৬/২৮১ নামে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করেন।
এ প্রসঙ্গে জাতি সঙ্গের তৎকালিন মহাসচিব বান-কি-মুন মন্তব্য করেন "টেকসই উন্নয়নের জন্য উন্নয়নের যে তিনটি স্তম্ভ -সামাজিক, আর্থিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন -এসবের মধ্যে সমতা আনতে হলে, বলে অর্থনীতির একটি নতুন নমুনা /ধারা নির্মাণ এখন অপরিহার্য হয়ে দাড়িয়েছে"।
এই দিবসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সম্প্রতি ১৫-১৭ মার্চ,২০১৯, আমেরিকার মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস সামিট।
লাইবোমিরস্কি ও তার সহযোগীদের গবেষণায় (২০০৫)প্রমানিত হয়েছে যে সুখী মানুষরা অন্যদের থেকে জীবনে অধিক সফল হন,দীর্ঘজীবি হন ও অধিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হন।কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কো-অপারেশন এন্ড কনফ্লিক্ট রিজুলেশন এর পরিচালক মি. পিটার কোলম্যান সুখের গুরুত্ব দিতে গিয়ে বলেন -" বিশ্ব সুখ সূচকের সঙ্গে বিশ্ব শান্তি সূচকের রয়েছে ঘনিষ্ট সম্পর্ক"।
মনে রাখতে হবে অসুখী মানুষ হতাশ,ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ ও বেপরোয়া মানুষ। তাদের দ্বারা আর যাই হোক শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব না।
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০১৮ অনুযায়ী ১৫৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫-তে।ভারত -১৩৩,পাকিস্তান -৭৫। সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় রয়েছে ঃফিনল্যান্ড,নরওয়ে,ডেনমার্ক, আইসলেন্ড, সুইজারল্যান্ড। ঘুরে ফিরে এরাই বারবার সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় থাকে। সবচেয়ে কম সুখী দেশের তালিকায় রয়েছে ঃব্রুন্ডি,সাউথ সুদান, তানজানিয়া, ইয়েমেন।
পশ্চাৎপট ঃ১৯৭২ সনে তৎকালীন বোম্বেতে ফিনানশিয়াল টাইমস এর এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে ভুটানের প্রাক্তন রাজা সর্বপ্রথম জিএন এইচ(গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) টার্মটি ব্যবহার করেন।তিনি বলেন "জিএনপি (গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাক্ট) এর চেয়ে জিএনএইচ এর গুরুত্ব অনেক বেশি। "
এরপর ২০০৫ সনে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট দ্বিতীয় জিএনএইচ এর প্রবর্তন করেন। ২০০৬ সনে এই প্রতিষ্ঠান আমেরিকায় জিএনএইচ বাস্তবায়নের জন্য পলিসি হোয়াইট পেপার প্রকাশ করেন।২০০৭ সনে থাইল্যান্ড সরকার জিএইচআই( গ্রীন এন্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্স) প্রকাশ করেন। ২০০৯ সনে আমেরিকায় গ্যালপ ওয়েল বিং ইনডেক্স চালু করেন।২০১০ সনে সেন্টার ফর ভুটান স্টাডিজ তাদের পূর্বতন ৪ স্তম্ভের বদলে সুখের উপাদান হিসেবে ৮টি উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করেন।সেগুলো হলোঃ শারিরীক, মানসিক ও আধাত্মিক স্বাস্থ্য ;সময়ের ভারসাম্য ;সমাজ ও কমিউনিটির প্রাণশক্তি ;সাংস্কৃতিক প্রাণশক্তি ;শিক্ষা ;জীবন -মান;গুড গভর্নেন্স ;ও পরিবেশ প্রাণশক্তি। ২০১১ সনে কানাডা সি আই ডব্লিউ(কানাডিয়ান ইনডেক্স অব ওয়েল বিং) প্রকাশ করেন।২০১২ সনে জাতিসংঘ ২০ মার্চকে বিশ্ব সুখ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।
সুখ কি মাপা যায়?
এমন কোন বাটখারা কি রয়েছে যা দিয়ে সুখের পরিমাণ মাপতে পারি? মনোবিদরা তেমন মাপন যন্ত্র আবিস্কার করেছেন। এই মাপন যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে ঃ১। পি এ এন এ এস( পজিটিভ এন্ড নেগেটিভ এফেক্ট সিডিয়ুল) ২। এস ডব্লিউ এল এস (স্যাটিশফেশন উইথ লাইফ স্কেল) ৩। এস এইচ এস(সাবজেক্টিভ হ্যাপিনেস স্কেল)
সুখ কি? সুখের সংজ্ঞা কি,সুখ কোথায়, কোথায় এর ঠিকানা, সুখের কি কোন গোপন রেসিপি রয়েছে -নাকি সুখ কেবলই সোনার হরিন? এসব প্রশ্ন আদিকাল থেকে মানব মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। সুখী থাকা মানে এই নয় আপনি কখনো অসুখী থাকেন না।সুখের প্রচুর সংজ্ঞা রয়েছে, তবে কোনটাই সর্বজন স্বীকৃত নয়।
রবার্ট হোলডেন সুখের একটি সংজ্ঞা এভাবে দেন" বাহ্যিক উপাদানের সঙ্গে সুখ শর্তযুক্ত বা সুখ কিনতে পাওয়া যায় -এরকম বিশ্বাসকে মাইনাস করে, আপনার যে প্রকৃত অবস্থান -সুখ সেটিই।"কথায় আছে -টাকা সুখ কিনতে পারে না। তেমনি ক্ষমতা, সম্পদসহ বাহ্যিক কোন উপাদানের সঙ্গে সুখ শর্তযুক্ত নয়।
রবার্ট হোলডেন "ডেসটিনেশন এডিকশন" বলে একটি টার্ম ব্যবহার করেন।এরমানে সুখের পিছনে হন্যে হয়ে যারা সারাজীবন দৌড়ান,সেটি এক ধরনের নেশা। হেথা নয়,হোথা নয়-অন্য কোথা, অন্য কোন খানে--এরকম মনে করে, আমরা অনেকেই সুখের সোনার হরিনের পিছনে ছুটে সারাজীবন পার করে দেই।তবুও মনে হয় সুখের নাগাল তো পেলাম না।
তাহলে সুখ কোথায়?
মনোবিদরা বলেন সুখ কোন বিশেষ জায়গায় নয়,সুখ নির্ভর করে কিভাবে আপনি জীবন যাপন করেন তার উপর। আপনি কিসের উপর বেশি মূল দেন?অর্থ,সম্পদ,ক্ষমতা, সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা? এই মুহূর্তে কি আপনাকে সুখী করতে পারে? এসব বিষয়ে একেক জনের একেক মত থাকবে। তাছাড়া যা আপনাকে সুখী করবে তা অন্যকে নাও করতে পারে। তবে এতো কিছু সত্বেও পজিটিভ সাইকোলজি বলে, আমরা সুখ সৃষ্টি করতে পারি, সুখ বৃদ্ধি করতে পারি এবং নিশ্চিত ভাবে সুখী হতে পারি।
কিভাবে সুখী হবেনঃ
ডোপামিন নামক একটি নিউরোট্রান্সমিটারকে "ভালো লাগার হরমোন " বলা হয়। গভীর ভালোবাসা বা মাদক যে তীব্র আনন্দ দেয়, তা এই ডোপামিনের জন্যই।নানা প্রক্রিয়ায় আমরা ব্রেইনের ডোপামিন লেবেল বাড়াতে পারি।
তবে
নিয়মিত ব্যায়াম করুন ;আশাবাদী জীবন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করুন ;জীবনে যা পেয়েছেন, হয়েছেন তার হিসেবে করুন, কি পাননি তা নয়;কোন বিষয়েই কারো সঙ্গে নিজেকে তুলনা করবেন না- কেননা মূলত জীবনে তুলনা বলে কিছু নাই। আপনি এ পৃথিবীতে অনন্য ও অসাধারণ ;কৃতজ্ঞ থাকুন ও তা প্রকাশ করুন-স্রস্টা আপনাকে অজস্র নেয়ামত দান করেছেন, পরিবার, সমাজ,আত্মীয়, বন্ধুগন থেকে অনেক কিছু পেয়েছেন।-এসব ভুলে থাকা অকৃতজ্ঞতা।তাই প্রতিদিন স্রস্টার কাছে অন্যদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন ও এ জীবনে যা পেয়েছেন, হয়েছেন তার জন্য গর্ব ও তৃপ্তি অনুভব করুন;বর্তমানে বাচুন,বর্তমানে জীবন যাপন করুন,অতীত,ভবিষ্যত বা অন্য কিছু যেন মনোযোগকে বিঘ্নিত করতে না পারে -একে আমরা বলি মাইন্ডফুলনেস;যারা আনন্দ দেয়,সম্মান করে তাদের সঙ্গে থাকুন ;জীবনে ভালো মন্দ বিরক্তি -যা আসুক তা মেনে নিন;যা করছেন গভীর মনোনিবেশ দিয়ে করুন, এতে নিমগ্ন হয়ে যান,এর মধ্যে ডুবে থাকুন -একে বলে ফ্লো;আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান বৃদ্ধি করে তেমন কিছু করুন;যা কিছু ভালো তা ধরে রাখুন,যা কিছু মন্দ সেসব "চলে যেতে " দিন ;জীবনের একটি বিশাল মানচিত্র ধারন করুন,যেরকম জীবন চান সেরকম জীবন গড়ে তুলুন(তবে এপিজি আবুল কালামের কথা মনে রাখবেন -স্বপ্ন সেটি নয় যা আমরা ঘুমে দেখি,স্বপ্ন হচ্ছে তা যা আমাদেরকে ঘুমাতে দেয় না);ভালোবাসুন- মানুষকে,প্রানীকে,প্রকৃতিকে;বেরিয়ে পড়ুন,ঘুরতে যান,প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকুন;কাছের মানুষদের "ধন্যবাদ " এর বার্তা পাঠান;ভালো আছি,সুখে আছি এটি হোক নিত্যদিনের জপ মন্ত্র ;শেয়ার করুন নিজের আনন্দ সুখকে;জীবনে অনেক ভাবে বাঁচা যায়,এক পথ বন্ধ হলে শত পথ খুলে যাবে।
বাঙ্গালী উৎসব প্রিয় জাতি। বিশ্ব সুখ দিবস জাতীয় ভাবে পালনের দাবি জানাচ্ছি। এদিন আমরা নেচে,গেয়ে আনন্দ উল্লাসে দিন কাটাবো। সবাই একত্রে থাকবো,একসঙ্গে জীবন উপভোগ করবো। নিজের জন্য ও অন্যদের জন্য সুখ সৃষ্টি করবো।