Friday, October 20, 2017

সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল-১৬: ব্লু হোয়েল বিতর্ক- মিথ না নকল,না পুরোটাই ভুয়া?

>এতো গাত্রদাহ,এতো চিত্ত- জ্বালা কেন..

> মরিয়া হয়ে প্রমান করিতে হবে " কিছু নাই-
কিছু নাই"....

>ওভার স্মার্টনেস দেখিয়ে কিছু লোকের কাছে সাময়িক ভাবে হিরো হওয়া যায় ( প্রচুর লাইক, কমেন্ট পাওয়া যায়), তবে অচিরেই ভাড়ে পরিনত হতে হয়

> কাকের মাংস কাক খায় না- তবে...

> কাদম্বিনী মরিয়া প্রমান করিল সে সত্যি মরেছে(  আত্ম হত্যা করে শিশুদের পুলিশের তদন্তে আসতে হবে জাতিকে জানাতে যে আমরা ব্লু হোয়েল/ ভিডিও গেইমে আসক্ত)
.............................................

১। আমরা দৃড়তার সহিত জানাচ্ছি আমরা কখনো দাবী করেনি বা করছি না যে দেশে " ব্লু হোয়েল" এসে গেছে সেটি প্রমানিত( এটি ডাক্তার হিসেবে আমাদের কাজ ও নয়)। এসব খবর আনে সাংবাদিকরা( তাই ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের মাধ্যমে তারা রহস্য উদগাটন করবে বা সরকারের কাছে সেটি প্রমান করার দাবী জানাবে)। অথচ উনারা আমাদেরকে এটি প্রমান  করতে বলে- হাউ ফানি।

অথবা পুলিশ,ডিবি,বিটিআরসি,তদন্ত বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল রিপোর্টটেড কেইসগুলো প্রযুক্তিবিদ দ্বারা পরীক্ষা করে আমাদের ও জনগনকে আশ্বস্ত করবে যে ব্লু হোয়েল নামে দেশে কিছু নাই।এতদিনেও কি আমরা তেমন ঘোষনা শুনতে পেরেছি?

তাহলে স্ব- ঘোষিত প্রযুক্ত বিশাদরদরা,রিপোর্টেড কেইস গুলো  নিয়ে গবেষনা দূরের কথা সে কেইসগুলো ভুয়া,বানোয়াট বলে তাদের ক্লিনিক্যাল এক্সাম ও সাক্ষাতকার পর্যন্ত না নিয়ে ঈর্ষা প্রসুত,বিদ্বেষের বমি উদগিরন করেই চলছে কেন?

২। ব্লু হোয়েল নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া,বিশেষ করে ফেইসবুকে যে অপপ্রচার, মাতামাতি, বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানো হয়েছে,হচ্ছে আমরা বলিষ্ঠ ভাবে সে সবের নিন্দা জানাই।

আমি অনেক জায়গায় বলেছি মিডিয়ার সেনসেশনাল নিউজ ও সংবেদনশীল ভাবে ঐ সব নিউজ কাভার না করলে, হিতে বিপরীত হতে পারে।সম্প্রতি ডেইলি স্টারে রেসপ নসিবল রিপোর্টিং অন সুইসাইড নিয়ে গঠনমূলক একটু লেখা প্রচারিত হয়েছে।
কিন্তু সামরিক সরকারের মতন নিউজই পুরো আউট করে দেওয়ার মতন " ডিকটোটোরিয়াল মাইন্ডেড" সাংবাদিকরা যখন দেশে ঘটে যাচ্ছে তেমন কিছু " বিরাজমান বাস্তবতাকে"  শুধু অস্বীকার নয়,এগুলো যে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করার দায়িত্ব তাদের সে দায়িত্ব ও নেয় না,বরং উল্টো আমাদের ( চিকিৎসকদের) ঘাড়ে সে  দায়িত্ব দিতে চায়- তখন হাসবো না কাদবো?

৩।  ব্লু হোয়েল অরিজিনাল না হলেও ফেইক বা বাংলাদেশি সংস্করনে এক ধরনের ব্লু হোয়েল/ রেড হোয়েল এর " সম্ভাব্য " উপস্হির কিছু আলামত পাওয়া যাচ্ছে। আমি একক ভাবে যে কটি ইভিডন্স পেয়েছি তা জানাচ্ছি ( অন্যদের কাছে আরো ইভিডেন্স থাকতে পারে):
ক)  ছবির ১ ও ২ নম্বর চিত্রে দেশের বহুল প্রচারিত ও তথাকথিত পন্ডিতরাও যে পত্রিকার রেফারেন্স বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন সে "প্রথম আলোর" ১৯ অক্টোবর ( বৃহস্পতিবার, পৃষ্ঠা-৯) প্রচারিত সংবাদটির প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।এখানে ছেলেটির পূর্ব ইতিহাস( বন্ধুর বক্তব্য)  আভাষ দেয় সম্ভাব্য ব্লু হোয়েলের এবং পরে পুলিশ ও তার মোবাইলে ব্লু হোয়েল গেইমের আলামত পায়( বিদ্বেষ পরায়ন,প্রচার কাঙ্গালরা বলবে এটি নিশ্চিত প্রমান নয়)। তবে এটি প্রাথমিক প্রমান তো বটে।তারা অন্তত একটি কেইস পরীক্ষা করে বলুক এসব " কিছুই না"।

খ) এই প্রথম আলোতেই ৪-৫ দিন আগে ২য় পৃষ্ঠায় সংবাদ ছাপা হয় চট্টগ্রামে এক ছেলেকে তার বন্ধুরা ব্লু হোয়েল গেইম খেলার কারনে পুলিশে ধরিয়ে দেয়।সে ছেলেকে পুলিশ কাউন্সিলিং রেখেছে বলে ঐ সংবাদে জানানো হয়।

গ) আমাদের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ১৩ বছরের এক ছেলেকে তার মা ও খালা কিছু ইভিডেন্স সহ ব্লু হোয়েল খেলছে বলে ভর্তি করান । ছেলেটি খেলা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলায় তার মা- বাবাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।একারনে সে চরম আতঙ্কিত ছিল।সাইকোথরাপি ডিপার্টমেন্ট থেকে কাউন্সিলিং পেয়ে তার আতঙ্ক কমার পর সে এখন ধাপে ধাপে তাকে কি করতে বলেছে,সে কতটুকু করেছে ও কতটুকু করতে পারেনি তা বিস্তারিত আমাদের জানায়।

ঘ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এর মনোরোগ বিভাগে ও তেমন একটি মেয়ে ভর্তি হয়( সেখানকার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিফাত-ঈ-সাইদ ফেইসবুকে এ নিয়ে এক বিতর্কে অংশ নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন সেটি এখানে তুলে দিলাম)।

## প্রচার ক্রেজি, গ্রুপিং ও লবিয়ে ওস্তাদ,ঈর্ষাকাতর উচু কন্ঠদারীদের ও জনগনের কাছে আমাদের  প্রশ্ন দেশে মানসিক স্বাস্থ্য এর   শ্রেষ্ঠ দুই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি দুই রোগীকে সেখানকার অভিজ্ঞ প্রফেসররা,মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা অতি সতর্কতার সহিত সম্মিলিত ভাবে দেখে,ইতিহাস নিয়ে ও প্রাথমিক ইভিডেন্স নিয়ে "সম্ভাব্য " ব্লু হোয়েল বলে ধারনা করছেন( হতে পারে সেটি নকল)। এসব প্রথিতযশা প্রফেসর, বিশেষজ্ঞরা মিথ্যে, ভুল কথা বলছেন,তারা ঘাস খেয়ে বিশেষজ্ঞ হয়েছেন?

অন্তত ডা. সিফাত যে বলেছেন  " সরাসরি অস্বীকার করা ঠিক হবে না, আমাদের এই নকল ব্লু হোয়েল নিয়ে হলেও মানুষকে সতর্ক করতে হবে"-

তিনি ও আমরা শুধু এটুকুই বলতে চাচ্ছি মাত্র।

ডিনায়েল সিনড্রোম : দেশে বিভিন্ন পরীক্ষায প্রায় নিয়মিত প্রশ্ন ফাস হচ্ছে অথচ কর্তৃপক্ষ বরাবরের   মতন এসব অস্বীকার করে আসছেন।জাতিগত ভাবে আমরা কি " ডিনায়েল সিনড্রোম " এ ভুগছি? তা না হলে " বিরাজমান বাস্তবতাকে" অস্বীকার করা হচ্ছে কেন?,সরাসরি ভর্তিকৃত রোগীদের থেকে প্রাপ্ত  প্রাথমিক ইভিডেন্স যেহেতু আসল না হলে ও নকল বা বাংলাদেশি সংস্করনের কোন এক ধরনের ব্লু হোয়েলের ইঙ্গিত  দিচ্ছে,  সেটি নিয়ে গবেষনা বা তদন্ত না করে মরিয়া হয়ে গলাবাজি করেই যাচ্ছে  এসব কিছু না, এসব ভুয়া।আগে তো প্রমান করুন এসব " কিছুই না"।

ঙ) বাংলাভিশন টেলিভিশনে কয়েকদিন আগে সরাসরি এক ব্লু হোয়েল আসক্ত বাচ্চা ছেলের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হলো।ছেলেটি সাবলীল ইংরেজিতে তার  ব্লু হোয়েলে আসক্তির কথা স্বীকার করে অন্যদের এই ক্ষতিকর খেলা না খেলার জন্য আবেদন জানায়।সারা জাতির কাছে এ সংবাদ চলে গেছে-

ঐ ছেলে,তার অভিভাবক, পুলিশ বা ঐ টিভির সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সবাই ভুয়া,বানোয়াট বক্তব্য জাতির সামনে দিয়ে গেলো? অতি বিপ্লবী,ডিনায়েল সিনড্রমো আক্রান্তরা ফেইসবুকে অন্যদের থেকে ধার করা তাত্বিক তথ্য না ছড়িয়ে ঐ সব রিপোর্ট  গুলোর যে কোন একটিকে চ্যালেঞ্জ করুক।নিজেরা করুক,প্রযুক্তিবিদ দিয়ে করুক না হলে সরকারের কাছে আবেদন করে করুক।

চ) এ ছাড়া ও দেশের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলোতে এরকম আরো অনেকগুলো কেইস রিপোর্টেড হয়েছে।এরা সবাই মিথ্যাচার করছে,বানোয়াট কাহিনী পরিবেশন করছে?

এক জন তর্কবিশারদ আমাকে বলে রোগীরা যা বলে সবই বিশ্বাস করতে হবে? কি আশ্চর্য  আমার রোগী/ অভিভাবকরা কোনটি মিথ্যে বলছে তা বুঝতে না পেরে সাইকিয়াট্রির মতন একটি বিষয়ে দীর্ঘ ২৭-২৮ বছর কাজ করছি? আর উনি বা কেন ভাবছেন এরা মিথ্যে বলছে? এরা কি তাদের কাছে প্রচারের জন্য গিয়েছে না  নীরবে আমাদের কাছে এসেছে শুধু চিকিৎসা নেওয়ার জন্য?

" কোন কিছুই না" এমন কিছুর  জন্য মানুষ কষ্ট করে হাসপাতালে ভর্তি হয়? সেলুকাস- কি বিচিত্র  এ দেশ।

৪।  এসব যুক্তিতে কুলাতে না পেরে নাছোড়বান্দার মতন তারা  বলে এগুলো  কিছু একটা যদি হয় ও তাহলে হবে মাস হিস্টেরিয়া( মাস সাইকোজেনিক ইলনেস),পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, কনডাক্ট ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।

হায় হতিষ্মি- আমাদের আবার নতুন করে এদের কাছ থেকে সাইকিয়াট্রি শিখতে হবে।ব্লু হোয়েল এলার্জির  কারনে এরা এসব কেইসগুলো দেখতেও রাজি নয়, পাশে এর প্রচার করে ফেলে।এই হচ্ছে বাংলাদেশের ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম এর নমুনা।তারা ঘরে বসে মনে করে বেশী প্রচারের কারনে যেমন হিস্টেরিয়া রোগ গনহারে হয়( মাস সাইকোজেনিক ইলনেস), এ ক্ষেত্রেও হয়তো তেমন কিছু হচ্ছে।

যারা সাইকিয়াট্রি জানে না তাদের এরকম খেলো,ভুল ভাবনা থাকতে পারে,সেটি তেমন দোষের কিছু নয়।তবে প্রকৃত তথ্য জানতে মাঠে যেতে দোষ কি?

ইয়াবা আসক্ত কেউ আমাদের কাছে আসলে তার মধ্যে পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার বা কনডাক্ট ডিসঅর্ডার পেতে পারি( এমনটাই স্বাভাবিক) । কিন্তু সেটিকে " ইয়াবা আসক্ত" না বলে পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, কনডাক্ট ডিসঅর্ডার  বলে কেন চালিয়ে দিতে হবে?  " ইয়াবা আসক্তিকে" এড়িয়ে কেন যাবো? ডাল ম্যাে কুচ কালা হ্যায়।

৫। তাদের সর্বশেষ অস্ত্র এভাবে প্রচারে সমাজের ক্ষতি হচ্ছে।তাই? আসুন দেখি

ক) অনেকে এতে আকৃষ্ট হয়ে পড়বে -

আত্মহত্যার কথা,ধর্ষনের কথা,মাদকাসক্তির কথা প্রচার করলে ও তাৎক্ষনিকভাবে কিছু ক্ষেত্রে এর পরিমাণ বেড়ে যায়।কিন্তু এর অন্যতম কারন এ ধরনের নিউজ মিডিয়া, বিজ্ঞান সম্মতভাবে,সঠিক গাইডলাইন না মেনে করে বলে।

২য়ত এসব প্রচারনা সচেতনতা / সতর্কতা ও সৃষ্টি করে।যদি ব্লু হোয়েল নামে আদৌ কিছু না ও থেকে থাকে( আমরাও তা চাই) এ উপলক্ষে ভিডিও গেইমস,ইন্টারনেট সহ অন্যান্য আসক্তি নিয়ে,আত্ম হত্যার প্রতিরোধ নিয়েও সামগ্রিক ভাবে আমাদের সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে সচেতনতা সৃষ্টির সুযোগ হয়েছে সেটি কি মন্দ কিছু? 

আমাদের হাসপাতালে যে ছেলেকে ভর্তি করানো হয়েছে সেটি ও অন্যান্য কেইসগুলো এই প্রচার ও সচেতনতার ফলশ্রুতি।  অনেক অভিভাবক জেনেছি এখন সন্তানদের মোবাইল,কম্পিউটার ব্যবহার নিয় সচেতন হয়েছে,যা আগে ছিল না।

ঈর্ষাকাতর,ভাড়রা কি খেয়াল করেছেন আমরা প্রতিটি সাক্ষাৎকারে মূলত বিভিন্ন আসক্তি,আত্ম হত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার কথা বলেছি।সেখানে ব্লু হোয়েল ছিল উপলক্ষ মাত্র।ভালো দিক দেখার ভালো মন লাগে।

খ) প্রচার এর ফলে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে-

এটিও সাংবাদিকদের দায়িত্ব কিভাবে, কতটুকু প্রচার করবে।তবে গৎবাধা,মুখস্হ বিদ্যার মতন " আতঙ্ক" বলে তার স্বরে চিৎকার যারা করছেন তারা আতঙ্কে কতজন নদীতে বা আগুনে ঝাপ দিয়েছে বা কতজন হার্টফেল করে মারা গেছে দয়া করে জানাবেন?  এ ক্ষেত্রে আতঙ্কের কি আছে? মানুষ সতর্ক হয়েছে, বড় জের বলা যায় কেউ অতিসতর্ক হয়েছে।

নিজের ও  সন্তানদের সম্ভাব্য  ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে কিছুটা অতি সতর্ক হলে ও সেটি দোষের কি, যেখানে আমাদের বেশীর ভাগ অভিভাবক সন্তানদের প্রতি যথাযথ তদারকি, নজরদারি করি না?

শেষ কথা বলছি আমরা মরিয়া হয়ে প্রমান করতে চাচ্ছি না যে বাংলাদেশে ব্লু হোয়েল গেইম আছে( চিকিৎসক হিসেবে এটি আমাদের কাজও নয়)।
তবে যারা পাগল - পারা,মরিয়া হয়ে " কিছুই না ", "সম্ভব না" না বলে আর্ত চিৎকার করছেন তাদের দায় এটি নিশ্চিত ভাবে প্রমাণ করা  এসব কিছু নাই।

আর যদি প্রমানও হয় এসব কিছু নাই, তাতেও আমাদের দেখা কেইসগুলো মিথ্যে হয়ে যায় না

বা এ উপলক্ষে আমরা ভিডিও গেইম আসক্তি,আত্ম হত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য এর পরিচর্যা নিয়ে যে সব বক্তব্য, মতামত রেখেছি সেগুলো নিষ্ফল হয়ে যায় না

No comments:

Post a Comment