এবিসি রেডিও তে প্রতি রবিবার রাত ১১-২০ মিনিটে প্রচারিত হয় জনপ্রিয় অনুষ্ঠান" যাহা বলিব সত্য বলিব( জেবিএসবি)"। নিয়মিত পরামর্শক হিসেবে সে অভিজ্ঞতা ও এই রবিবারে প্রচারিত কাহিনী আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি
কাহিনী সংক্ষেপ :
সোহেল রানা, বয়স ২৫। জন্ম ফরিদপুর । ব্যবসার কারনে বাবা দিনাজপুর থাকেন।
বাবা সেখানে ২য় বিয়ে করেন। জীবনে তাদের অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে।ফলের ব্যবসা করে মোটামোটি ভালো অবস্হায় আছেন।
ক্লাশ এইটে পড়ার সময় তার এক বন্ধু জোটে, যে সৎ মার সঙ্গে থাকতো ও সিগারেট খেতো।
সেও সিগারেট খাওয়া শুরু করে এবং যথারীতি ফেন্সিডিল সহ অন্যান্য নেশায় জড়িয়ে পরেন।
নেশার মাত্রা বাড়ে তাই বাড়ে টাকার ডিমান্ড।
কোথায় পাবে এত টাকা?
নেশার টাকা ভূতে জোগায়।এটি একটি মিথ।তাদের সে টাকা জোগাড় করতে হয় যে কোন ভাবেই হোক।
তার খালাতো ভাই এমবুলেন্স চালাতো।তখন তৎকালিন বিরোধী জোটের অবরোধ চলছিল।
তারা ভাবলো মানুষ যাতায়তের যানবাহন পাচ্ছে না।ওআমরা এই সুযোগে কিছু মানুষ পারাপার করবো।সেখানে তারা ৪-৫ জন থাকবে ও দু'একজন সাধারন যাত্রী নেবে।কোন এক পছন্দ মতন জায়গায় গিয়ে যাত্রীদের চোখে মলম ঢলে তাদের সর্বস্হ কেড়ে নেবে।
এ ভাবে তারা একটি সঙ্গবদ্ধ " মলম পার্টি" গড়ে তোলে।
নিয়মিত ভাবে তারা অসহায় যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা- পয়সা ছিনিয়ে নিতে লাগলো।
একদিন তারা ৫ জন যাত্রীর ছদ্মবেশে অন্য দু'জন নিরীহ যাত্রী উঠান।খেলনা পিস্তল দেখিয়ে তারা তাদের সব কেড়ে নেয়।কিন্তু একজনের হাতে একটি স্বর্নের আংটি ছিল।তারা সেটি নিতে চাইলে ঐ ব্যক্তি বাধা দেয়।
দস্তাদস্তি চলে।
একে পর্যায়ে গলায় মাফলার পেচিয়ে তাকে খুন করা হয়।
ঐ লাশ তারা এক বাগানে ফেলে আসে ও সে লাশ বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়।
(পাঠক এ পর্যায়ে আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটি করুন কাহিনী না বলে পারছি না।আমার আপন চাচাতো ভাই নর্থ সাউথ ইউনিভারসিটি এর লেকচারার হিসেবে সবে মাত্র যোগ দিয়েছে।এ দিকে কানাডায় তার পিএইচডি করতে যাওয়ার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে।সে সবে মাত্র বিয়ের পাঠও চুকিয়ে ফেলেছে।তাকে প্রায়ই ঐ ভার্সিটি থেকে সিএনজি করে সন্ধার দিকে বাসায় ফিরতে হতো।তেমনি এক কু সন্ধায় বনানী আর্মি এলাকার কাছাকাছি জায়গায় এ রকম এক সঙ্গবদ্ধ মলম পার্টির খপ্পরে পড়ে নির্মম ভাবে জীবন হারাতে হয় তাকে)।
এদিকে তার ঐ বন্ধুর সঙ্গে এক মেয়ের টেলিফোনে আলাপ হয়।
দীর্ঘ দিন সে ঐ মেয়ের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে যায়।
ঐ মেয়েকে পটিয়ে সে প্রায়ই বিকাশ করে টাকা পাঠাতে বলতো।মেয়েটি সরল বিশ্বাসে এ ভাবে তাকে অনেকবার টাকা পাঠায়।
সে ঐ টাকা তার নেশার পিছনে ব্যয় করতো।
এক সময় মেয়েটি তাকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়।সে এটিকে আরো বেশী টাকা আদায়ের সুযোগ হিসেবে নেয়। সে ঐ মেয়েকে তার কাছে চলে আসতে বলে।
মেয়েটি রঙ্গিন স্বপ্ন নিয়ে, ভিন্ন জেলা থেকে কাউকে কিছু না বলে বেশ টাকা- পয়সা ও স্বর্নালঙ্কার নিয়ে তার কাছে যায়।
ছেলেটি পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে রাখে ও সোহেল রানাকে সঙ্গে নেয়।
পূর্ব পরামর্শ মত তারা মেয়েটিকে বলে বাড়ীতে তাড়াতাড়ি যেতে হলে মেঠো রাস্তা দিয়ে পাট খেতের আড়াল দিয়ে যেতে হবে।তারা দু' বন্ধু মিলে মেয়েটিকে পাট ক্ষেতের ভিতরে নিয়ে তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে ও তার সব কিছু হাতিয়ে নেয়।
ঐ মেয়েটির লাশও সেখানে বেওয়ারিশ হিসেবে থেকে যায়।
রানাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় এ ভাবে একটি নিরীহ মেয়েকে খুন করার সময় আপনার ফিলিংস কেমন ছিল।
সে বলে আমার কোন ফিলিংস ছিল না; নেশা করবো টাকা লাগবে এ চিন্তাই কাজ করতো।
এ পর্যন্ত করা তার কোন অপরাধের কথাই অন্যরা জানে না।
তবুও পুলিশের ভয়,নেশার জন্য আরো এ রকম ঝুকি পূর্ন পাপ কাজ করতে হবে, এ সব ভেবে সে ঢাকা চলে আসে।
তার ভাষ্যমতে সে এখন ভালো থাকতে চায়।সে নেশা ছাড়তে চায়।নেশার কারনেই তাকে এতো সব কুকর্ম ও খারাপ কাজ করতে হয়েছে।
সে সবাইকে জানাতে চায় যাতে তার মতন কেউ যেন নেশাগ্রস্ত না হন, তাহলে তারও পরিনতি তার মতন হবে।এ কারনে সে জেবিএসবি অনুষ্ঠানে এসে নিজের পাপ কাজের স্বীকারোক্তি দিতে এসেছে।
আমার কিছু পর্যবেক্ষণ :
১।মাদকাসক্তি, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রথম পাঠ নেওয়া প্রভৃতি হয় বখে যাওয়া,বিপদগামী বন্ধুদের চাপ ও প্রলোভনের কারনে। মাসুদ রানার ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে।
মা- বাবা যদি সন্তানের উপর খবরদারী না করেও সঠিক নজরদারী রাখে, তাহলে মন্দ বন্ধুদের সঙ্গ থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে পারেন।
২। প্রকাশ্য রাস্তায়,যানবাহনে মানুষের সর্বস্ব লুন্ঠিত হবে,মানুষ খুন হবে এর দায়ভার রাস্ট্র,পুলিশ প্রশাসন এড়াতে পারে কি? নিরাপদে চলাফেরা করার নিশ্চয়তা ও কি নাগরিকদের থাকবে না?
৩। মানুষ খুন হয়ে লাওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন হবে,তার খুনের অপরাধীরা ধরা ছোয়ার বাইরে থাকবে,আমরা কি এমন রাস্ট্র,সমাজ চেয়েছিলাম?
এ ভাবে অপরাধীরা ছাড় পেয়ে গেলে,বিচার ও শাস্তি না পেলে অপরাধীরা আরো ভয়ঙ্কর অপরাধ করবে,আমরা কি সেটিই আমাদের দেশে দেখছি না?
৪। মোবাইল,ফেইসবুক,ইন্টারনেটের অপব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।
এ সুযোগে কিছু প্রতারক চক্র তৈরী হয়েছে,যারা প্রেমের ফাদ ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেয় বা মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের সর্বনাশ করে থাকে।
যাকে চাক্ষুষ দেখিনি,যার সমন্ধে বাস্তবে কোন কিছু জানা শোনা হয়নি, এমন কারো সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়ার মতন বোকামি অহরহ হচ্ছে।
শুধু তাই নয় সে অচেনা পুরুষের টানে নিজ পরিবার ছেড়ে দূরের এক অজানা,অন্ধকার পথে ছুটে যেতে ও দেখছি অনেককে।এমন হটকারী, অর্বাচীন সিদ্ধান্ত কেমনে তারা নেয়? এত অঘটন ঘটছে তা দেখেও কি এই কিশোরী তরুনীরা শিখবে না? গার্জিয়ানরাও আর কত দিন এ রকম বেখেয়াল থাকবেন?
৫। অনেকেই সিগারেটকে মাদক মনে করেন না( তাহলে যে অনেক শিক্ষিত,ভদ্রজনেরাও ও মাদকাসক্ত বলে চিন্হিত হবেন)।
কিন্তু সিগারেট হচ্ছে সকল মাদকের মা।এ থেকেই জন্ম নেয় অপরাপর মাদকাসক্তির।ক্লিনিকে ভর্তি মাদকাসক্তরা অন্য সব মাদক ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।কিন্তু তারা কিছুতেই সিগারেট ছাড়তে রাজী হন না।
কাকুতিমিনতি করে বলেন স্যার সবই তো ছেড়ে দিয়েছি,আমাদের কি বাচতে দেবেন না,অন্তত সিগারেট খেতে দিন।
তাই সিগারেট নেশাকে হাল্কা করে দেখার সুযোগ নেই।
৬। এখানে বর্নিত দুটি খুনই হয়েছে নেশার টাকা জোগাড় করার জন্য।
ঐশীর কথা সবার মনে আছে?
এ রকম অনেক চুরি,ছিনতাই, খুন হচ্ছে মাদকাসক্তির কারনে।
দেশের অপরাধের অর্ধেক কমানো যেতো যদি আমরা মাদকাসক্তির সঠিক চিকিৎসা দিতে পারতাম ও একে প্রতিরোধ করতে পারতাম।
No comments:
Post a Comment