বাসের ড্রাইভার, হেলপারদের দ্বারা নারী ধর্ষণ ও পরে হত্যার ঘটনা প্রায়শই আমরা সংবাদ পত্রের মাধ্যমে জেনে আসছি। কেন পরিবহন শ্রমিকদের দ্বারাই এরকম ঘৃন্য, নৃশংস কাজ বেশি হয়ে থাকে, সে সবের মনো-সামাজিক বিশ্লেষণ নিয়ে একটি লেখার ইচ্ছে রয়েছে।
তবে আজ শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে এ নিয়ে স্বল্প দুচারটি কথা বলবো।
ঢাকা থেকে সোনার গা যাচ্ছিলাম বাসে করে। পথিমধ্যে পিছনে শোরগোল শুনে দেখি এক বৃদ্ধ লোক অজ্ঞান হয়ে গেছে। সবাই ওনাকে নিয়ে ব্যস্ত। আমি ও উঠে ওনাকে দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম কি হতে পারে ও কি করা যায়।
পাশে তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তিনি হাই প্রেসার ও ডায়েবেটিস এর রোগী। তবে ইনসুলিন নিচ্ছে না এবং আজ রোজা ও ছিলেন না এবং কিছু ক্ষন আগেই নাস্তা করেছেন। তাই সুগার বেশি কমে যাওয়ার ( হাইপোগ্লাসিমিয়া) সম্ভাবনা কিছুটা কম মনে হলো।যাহোক আমরা নিকটেই একটি ক্লিনিকে ওনাকে নামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করি যাতে প্রাথমিক ইমারজেন্সি চিকিৎসা পায় ও যেহেতু তাদের এম্বুলেন্স রয়েছে দুরুত ঢাকা মেডিকেলে নিতে পারে।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক অনেকটা মোটা তাই তাকে তার ছেলে এই অবস্থায় একা নামাতে পারছে না। পিছন থেকে কয়েকজন হেল্পারকে ঢেকে বললো একটু সহযোগিতা করতে। সে সামনের গেইটে দাড়িয়ে বিরক্ত কন্ঠে বলছে, কেন তার আত্মীয় নেই? আর আপনারাই বা কি করছেন? তবুও সে উঠে আসেনি।
কোনভাবে আমরা অনেকে মিলে লোকটিকে দরজার কাছে নিয়ে যাই।গেইট থেকে নামানোর সময় হেল্পার লোকটিকে ধরে এমনভাবে নামিয়ে দিলো যেন একটি আপদ বিদায় করত পেরেছে। কোনরকমে নামিয়ে দিয়েই ঝট করে গেইট বন্ধ করে ড্রাইভারকে ইশারা করে দুরুত বাস চালাতে।
আমরা আশংকা করছিলাম রোগী বোধ হয় ঠিক মতন নামতে পারেনি এবং যেভাবে বাস দুরত টান দিয়ে ছেড়ে দিলো না, জানি তারা আহত হলো কিনা।কিন্তু হেল্পার, ড্রাইভারের ভয়ে বা ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য হোক, কেউ কিছু বললো না।
আমি আমার স্বভাবগত প্রতিবাদ করার অভ্যাসের কারনে কিছু বলাতে হেল্পার, ড্রাইভার সহ এমনকি বাস যাত্রীদের কেউ কেউ এ নিয়ে কথা না বাড়াতে বলে। আমার অভিজ্ঞতা ও বলে কিছু বলে লাভ নেই।
অন্যায় হোক এমনকি খুন হোক, পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কিছু বললে উল্টো নাজেহাল হতে হবে।
দেশের মানুষ ক্রমশ অনুভুতিহীন হয়ে পড়েছে। চোখের সামনে অন্যায়, অবিচার হলেও প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করার কথা ভাবে না।কেউ চায় না ঝামেলায় জড়াতে। সবাই নিজের মানসম্মান বজায় রাখতে বেশি সচেষ্ট।
তবে তরুণ ছাত্ররা কখনো কখনো প্রতিবাদ করে। তবে তারা ও নিস্তার পায় না। সংঘবদ্ধ পরিবহন শ্রমিকরা তাদের ঘেরাও করে কোন এক নিরাপদ জায়গায় নিয়ে অত্যাচার নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। ক্ষেত্র বিশেষে গুমও করে ফেলে।
কিছু দিন আগে এক তরুনকে বাসের আঘাতে আহত করে তাকে সে আহত অবস্থায়ই পাশের খালে ফেলে দিয়ে জীবন্ত মেরে ফেলার মতন নৃশংস ঘটনার কথা আমরা পত্রিকার মারফত জেনেছি।
এক্সিডেন্ট করে আহত করেই তারা ক্ষ্যান্ত হয়নি, আপদ যাতে না থাকে তার জন্য এই নিষ্ঠুর নির্মম লোক গুলো সে মুমূর্ষু তরুনকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো দূরে থাক, তাকে ওখানে এভাবে রেখে দিলেও হয়তো তরুনটি বেচে যেতো। পাষন্ডরা তাকে পানিতে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
এই অভিজ্ঞতা গুলো আমাদের কি বলে? পরিবহন শ্রমিকদের অনেকেই (সবাইকে ঢালাও দোষারোপ করা অন্যায্য হবে) বিভিন্ন জোরজবরদস্তি, মারামারি, অন্যায় করতে করতে এমন নির্মম,নিষ্ঠুর হয়ে উঠে যে, তাদের ভিতর মানবিকতার কোমল মনটি পাথরের মতন শক্ত হয়ে যায়।
শুধু এরা কেন যেসব কিশোর তরুণ ছোটকাল থেকে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শক্তি প্রদর্শন, মাস্তানী করে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাঁরা সবাই পরে একেকজন ক্রিমিনাল ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠে।
এছাড়া পরিবহন শ্রমিকরা মদ সহ বিভিন্ন মাদকে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে যা তাদেরকে অপরাধী ও নিষ্ঠুর কাজে প্রলুব্ধ করে, সাহসী করে তোলে।
সর্বোপরি এরা থাকে যৌন অতৃপ্ত। পারিবারিক বা বিবাহিত জীবন অনেকের জন্য নামকাওয়াস্তে থাকে। ফলে তারা ক্রমশ অসামাজিক, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পরে( পতিতালয়ে যাওয়া) । মাদকের কুফল তো থাকেই।
তাহলে ব্যাপারটি দাড়াচ্ছে কিছু ক্ষুধার্ত ( যৌন অতৃপ্ত বা বিকৃত যৌন কামনায় উত্তেজিত) শক্তিশালী ( পাওয়ারফুল-) হায়েনার সামনে - একটি দুর্বল, নিরীহ শিকার ( নারী) যখন একাকী, নির্জন এলাকায় পড়ে যায়, তখন এসব হায়েনা পাশবিক শক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। খুবলে খুবলে মাংস টেনে হিছড়ে খেতে থাকে। শুধু তাই নয় এরপর এ আপদ রেখে বিপদে পড়বো কেন মনে করে, অবলীলায় ভিক্টিমকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে।
তারা ধর্ষিতা নারীকে ময়লা আবর্জনার মতন বাস ট্রাক থেকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেয়।ভাবখানা এমন এটি নোংরা, অপবিত্র জিনিস যা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে একে দুরুত ফেলে দিয়ে বাসটিকে কল্ঙক ও কদর্য মুক্ত করলো। সর্বোপরি মনে করে কোন প্রমাণ রইলো না আমাদের আর ধরবে কে?
সমাধান নিয়ে সংক্ষেপে বলছি
১। পাওয়ারফুল বা ক্ষমতাবান হওয়ার যে সিস্টেম পরিবহন খাতে চলে আসছে সেটার দিকে নজর দেওয়া। কোটি কোটি টাকার খেলা যেখানে সেখানে স্হানীয় রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, মাস্তান গ্রপ,পুলিশ বাহিনী সহ অনেক রথি মহারথীরা জড়িত হয়ে পরে। এরকম অপকর্মের সহযোগী হয়ে তারা ও ক্রমশ মাস্তান, সাহসী, নির্মম,নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়ে উঠে। কিন্তু এ সিন্ডিকেট ভাঙ্গবে কে?
দ্বিতীয়ত এরকম বিপদজনক পরিবেশ ও লোকদের কিভাবে এড়িয়ে চলতে হব কর্মজীবী নারী, ছাত্রী সহ অন্য নারীদের তা জানতে হবে। এ ব্যাপারে খুব সাবধান ও সচেতন হয়ে চলতে হবে। কেননা নিরাপত্তার ব্যাপারটি সর্বশেষে নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে।
৩য়ত দেশের সব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। এমন সিস্টেম থাকতে হবে যাতে প্রতিটি পরিবহন কখন কি ঘটছে তা মনিটর করা যায় ও তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় (সিসি ক্যামেরা, অন্য কোন ভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা বা মালিক পক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের তত্বাবধান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা -ইত্যাদি) ।
চতুর্থত পরিবহন শ্রমিকদের মাদক গ্রহণ বিষয়ে তল্লাশি, পরীক্ষা নিয়মিত করতে হবে।অন্য যেকোন সেক্টররে তুলনায় এখানে মদ সহ অন্যান্য মাদক গ্রহণের হার অধিক। সম্প্রতি জানা গেছে এদের ৫০% এর চোখের সমস্যা থাকে যা তারা ও জানে না চিকিৎসা তো নেয়ই না।চোখ পরীক্ষা সহ মাদক পরীক্ষা নির্দিষ্ট সময়ের পর পর করার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।
৫ মত সামাজিক প্রতিরোধ থাকতে হবে। চোখের সামনে রাস্তা ঘাটে অহরহ অপরাধ ঘটছে আমরা "ভদ্রলোক " সাজতে, মানসম্মান রাখতে বা বিপদ এড়িয়ে চলতে গিয়ে এসবকে এড়িয়ে যাই।কোন সরকার বা আইন এসব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না যদি না নাগরিকরা এ নিয়ে সোচ্চার হয়,প্রতিবাদী হয় ও এরকম অন্যায়কে তাৎক্ষণিক রুখে না দাড়ায়।