Saturday, November 26, 2016

রোগ কাহিনী:৯

বাচতে হলে জানতে  হবে

১। জোর করে স্ত্রীর সঙ্গে শারিরীক সম্পর্কও "ধর্ষন" এর সামিল

২। যৌন সমস্যার ৮০-৮৫% মানসিক সমস্যা( বাকীগুলো হরমোনজনিত বা ভাসকুলার)

৩। যৌন বিষয়ে খোলা মেলা আলোচনাকে নিরৎসাহিত করলে বিবাহিত জীবনে সঙ্কট দেখা দিতে পারে

৪। যৌন অনাগ্রহ ও একটি  মনো-যৌন সমস্যা যার যথাযথ মানসিক চিকিৎসা রয়েছে

( লেখাটি দীর্ঘ হলেও পুরোটি পড়ুন।দেখুন জানার ও শেখার কিছু আছে কিনা।অশ্লীল লেখা মনে করে মাঝ পথে পড়া থামিয়ে দেবেন না)
................................................
কাহিনী সংক্ষেপ:

লাবনী( ছদ্ম নাম), বয়স ২০ অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী।

১ মাস হলো বিয়ে হয়েছে
এরেন্জড বিয়ে।তার ভাষ্য মতে:

বিয়ের আগেই মা-বাবাকে বলেছি যত ক্ষন পর্যন্ত ওনার সঙ্গে সহজ হতে না পারবো তত দিন শারিরীক সম্পর্কে যাবো না।

বিয়ের আগেই উনার কিছু জিনিস আমার পছন্দ হয়নি।আমাকে দেখতে আসার দিন উনার সঙ্গে আমার রুমে কথা হচ্ছিল।এটি আমার বিছানা জানার পর উনি বলেন তুমি তো আজ সারা রাত আমার কথা চিন্তা করবা।এ ছাড়া উনি আমার সামনেই প্যান্টের জিপার আটকায়।এ গুলো আমার মধ্যে ঘৃনার সৃষ্টি করে।

স্বামী ডিভি লটারী পেয়ে আমেরিকা প্রবাসী।
মা-বাবা বলে মানুষকে একবার দেখে চেনা যায় না,পাত্র আমেরিকায় থাকে তোমাকেও নিয়ে যাবে,এমন পাত্র পাওয়া যাবে না।

ঠিক আছে রাজী হলাম কিন্তু ট্রাস্ট না আসা পর্যন্ত শারিরীক সম্পর্কে যাবো না।

বিয়ের ১ম রাত অসুস্হতার কথা বলে কাটিয়েছি।
২য় রাত উনি টাচ করতে চায় কিন্তু আমি বাধা দেই।

সে বলে এগুলো নরমাল,সবাই করে।আমি তবুও বাধা দেই।উনি বাথরুমে গিয়ে তার বোনের সঙ্গে কথা বলে এসে আমাকে বলে এখনি দরকার কোন কথা শুনবো না।

আমি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাই।সে বলে তোমার উপর জোর করবো,কেন রাজী হচ্ছো না,অন্য কোথাও কি রিলেশন আছে?

আমি এক পর্যায়ে অনেক ভয় পাই ওপাগলের মতন আচরন করতে থাকি।বাথরুমে ঢুকে দেয়ালে আকিঝুকি আকি আর বলতে থাকি কেউ বিশ্বাস করে না,কেবল মিথ্যে কথা বলে।

এর পর ঘরে সবাই ঢুকে।উনি বলেন আমার ফ্রেন্ডরা  না বলাতে আমি এ রকম করছি।এতে বাবা আমার ফোন নিয়ে নেয়।আমাকে পাশের রুমে নেওয়া হয়।
পর দিন সকাল বেলা উনি ঐ রুমে গিয়ে আমাকে ডাকে,আমি ভয় পেয়ে কোনায় চলে যাই।পরে দাদা  এসে ওনাকে নিয়ে যায়।

পরের রাত খাওয়া-দাওয়ার পর  উনি বলেন কিছু করবো না,চলো আমরা গল্প করি।তিনি বলেন তুমি তোমার মা বাবাকে কি বলেছিলে?। আমি বললাম ইজি না হওয়া পর্যন্ত এ সব হবে না বলেছি।

উনি বলেন আমাদের ব্যাপারটি সবার কাছে জানা জানি হয়ে গেছে,সবাই অন্য রকম ভাবছে ইত্যাদি।

এক পর্যায়ে আমি বলি আপনি আমাকে ছেড়ে দিন।এমন সময় ওনার বোন এসে বাহির থেকে দরজা আটকে দেয়।বলে এটি তো খুশীর জিনিস,আমাকে বুঝাতে চায়।বোন বলে দরজা খুলবো না,একটি মেয়েকে জোর করে বিছানায় নিতে পারবি না? তোর অধিকার জোর করে হলেও আদায় করে নিবি।

স্বামী বলে ৬ মাস পর হলেও করবা,এখন ৫ মিনিট সময় দিচ্ছি তুমি রেডি হও।
আমি আতঙ্কিত হয়ে এন্টি কাটার ও চাকু নিয়ে দাড়াই।
সে দরজা খোলে সবাইকে ঢেকে আনে।সবাই আমাকে ধরতে চায়।আমি বলি ধরবে না,ধরলে লাগাইয়ে দেবো।
মা আমাকে ধরে হাতে কামড় দেয় যাতে হাত থেকে চাকু পরে যায়।উনিও এগিয়ে ধরতে আছেন।আমি হাত ঘুরাতে ওনার হাতে লেগে হাত কেটে যায়।আমি জেঠাতো ভাইয়ের শার্ট ধরে কাদতে থাকি ও বলি ভাই আমি এ সব পারবো না,আমাকে সাহায্য করো।

উনাকে হাসপাতালে নিয়ে ব্যান্ডেজ করে আনা হয়।তার বোন এসে কান্না কাটি ও জেদ করে।বাবা বলে আমি আর বাসায় যাবো না।এতে আমি ভয় পেয়ে যাই।
রাতে মা ও স্বামী একজন গাইনিকলজি
স্ট এর কাছে নিয়ে যান।
ওনাকে সব বলি।উনি মাকে বলেন মেয়েকে জোর করবেন না এতে ডিভোর্স পর্যন্ত চলে যেতে পারে।এও বলেন স্বামী যাতে নিজেদের বিষয় তার বোনকে কিছু না বলে।

রাতে বাসায় নালিশ বসে।

দাদা বকে,চাচা স্বামীকে বলে ওর দু'গালে দুটি চড় মেরে দিতে পারলে না? আব্বুও কয়েকবার মারতে আছে।
আমি বলতে চাইলাম আমার দ্বারা এ সব সম্ভব না। চাচা বলেন বিয়ে মানে এ সব হয়।
সবার কথা অনুযায়ী আমাকে উনার পা ধরে মাফ চাইতে হয়।

উনি বলেন আপনার আর পড়া লেখার দরকার নাই।এরপর আমাকে গৃহবন্ধি করে রাখে।কোথাও যেতে দেয় না।

উনাকে বলি আজকের রাত এভাবেই থাক।উনি বলেন ঠিক আছে ঘুমাও।উনার বোন দরজায় কান দিয়ে ছিলেন আমরা কিছু করছি কিনা।পরদিন ওনার বোন ওনাকে জিজ্ঞেস করে কয়বার করছোস,দুই বার না তিন বার(সবাই আশা করেছিলেন ঐ দিন আমরা কিছু করবো)।উনি সমস্যা নাই বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

একদিন পর আবারোও উনি পীড়াপীড়ি করাতে আমি রাজী হই।( আমি সারাক্ষন চোখ বুজে ছিলাম)।

বেশী চাপে থাকলে আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।একদিন রাতে না হওয়াতে ভোর বেলা আমার মাথা ধরে ঝাকি দিতে থাকে ও বলে এখনো তোমার শরীর ভালো হয়নি,আমার যদি নিড পূরন না হয় কেন এতো কিছু করবো,বাজার করবো না ইত্যাদি।উনি সব কথা রেকর্ড করে ওনার বোনকে শুনায়।

উনাকে টাচ করতে না দিলেই বলে তোমার অন্য কোথাও রিলেশন আছে।
ওনার বোন বলে আমার ভাই যদি এ ভাবে কন্ট্রোল করে ওর সেক্স নষ্ট হয়ে যাবে,তুমি আসলেই সংসার করবে কিনা,ওর সুখ না হলে,নিড পূরন না হলে বিয়ে করে কি লাভ?

ওনার বোন আমাকে গাইনীর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় ও তাড়াতাড়ি কনসিভ করার ঔষধ চায়।হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছেও কনসিভ করার ঔষধ চায়।
স্বামী প্রায়ই খোটা দিয়ে বলে আমি চলে গেলে তুমি তো উড়াল দেবা।ওনার বোন বলে তোমার আব্বু আম্মুর লাভ ম্যারিজ হয়েছে এবং তারা বিয়ের আগেই শারিরীক সম্পর্ক করেছে।

আমি বলি আপনার প্রতি ফিলিং আসে না, আমি কি করবো। উনি রেগে গিয়ে বলেন বিয়ের  পূর্বে তোমার কোন ছেলের সঙ্গে শারিরীক সম্পর্ক হয়েছে তাই আমার প্রতি ফিলিং আসে না।বলেন তার সঙ্গে তোমাকে বিয়ে দিয়ে দেবো।

আমার এক বান্ধীর বাসায় বেড়াতে যাই।উনি বলেন দেখো তোমার ফ্রেন্ডরা কয় টাকার জিনিস পরে,আর আমি তোমাকে বিয়েতে ৪০ হাজার টাকার লেহেঙ্গা কিনে দিয়েছি,ওরা কি খায় আর আমাদের বিয়েতে কি খাবার দাবার ছিল।

রাতে ঘুমিয়ে যাই। সকালে উঠে দেখি ড্রয়ারে আমার গয়না,ওনার গয়না এমনকি ওনার কাগজ পত্র কিছু নাই।জিজ্ঞেস করি কি করেছেন, উনি বলেন আমি রেখেছি চিন্তা করো না।

আমার মা-বাবার সঙ্গে একদিন উনার কথা কাটাকাটি হয়।উনি বলেন আমি সেইফ ফিল করি না,আমি থাকবো না।পরদিন ওনার বোন আসে,উনি বলেন আমি সরি বলবো না।
সব কিছু দেখে আমি অসুস্হ হয়ে পড়ি।
বুকে প্রচন্ড ব্যাথা হয়।মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হই।

সেখানকার ডাক্তাররা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে বলেন।

আমার এখন ওনাকে কোন ভাবেই সহ্য হচ্ছে না

আমার কিছু পর্যবেক্ষন ও মন্তব্য:

ক।আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে ৮০-৮৫% যৌন সমস্যা মূলত মানসিক সমস্যা।

অনেক ধরনের যৌন সমস্যা রয়েছে

তবে সব চেয়ে কমন সমস্যাটি হলো যৌনতায় কম সক্রিয়/ কম উদ্দীপ্ত হওয়া( hypoactive sexual disorder)।আরেকটি হচ্ছে যৌন অনীহা,ঘৃনা,অরুচি বা বিরক্তি(sexual aversion disorder)।

যৌন অরুচি বা ঘৃনা,বিরক্তি একটি গভীরতর বিরাগ।তারা শুধু যৌনতায় কম উদ্দীপ্ত হয় তা না,তারা সকল প্রকার যৌন স্পর্শকে পর্যন্ত এড়িয়ে চলে।যে কোন যৌন সংস্পর্শকে তারা ঘৃনার সঙ্গে প্রত্যাখান করে থাকে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা কোন এক সময় করা যাবে।এ ক্ষেত্রে এতটুকু বলে রাখি এ দুটি যৌন সমস্যাই মানসিক চিকিৎসায় সারানো যায়।চিকিৎসা নিলে লাবনীর ও তার স্বামীকে এমন করুন ও জটিল অবস্হায় পড়তে হতো না।

এই কেইসের পর্যবেক্ষন:
১। বিয়ের আগেই লাবনী বলেছে তার যৌন জড়তা বা অনাগ্রহ রয়েছে।তার মানে এটি প্রাথমিক স্তরের রোগ যার ভিত্তিমূল গভীরে, যা নিছক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠিক করার মতন নয়।

২। বিপরীত দিকে তার স্বামী প্রথম দিন থেকে তার প্রতি তীব্র যৌন আকর্ষন বোধ করতো এবং এটিকে সে ও তার বোন নিজেদের অধিকার বলে মনে করে।

৩। এমনকি বিবাহিত জীবনেও স্ত্রীর অমতে জোর করে শারিরীক সম্পর্ক করা যে বেআইনী এটি অনেকের মতন তাদের কারোই জানা নেই।

৪। বেআইনী হোক বা না হোক এটি যে একটি মানসিক রোগ এটি তাদের মতন আমাদের দেশে অনেকেই জানে না।

৫। জোর করলে যে পরিস্হিতি আরো জটিল ও খারাপ হবে এটি তাদের কারো ধারনায় ছিল বলে মনে হয় না।

৬। মনের বিরুদ্ধে জোর করাতে যৌন অনাগ্রহ,অরুচি এখন স্বামী ঘৃনায় রূপ লাভ করেছে।লাবনী এখন বলে আমি তাকে সহ্য করতে পারছি না

৭। অথচ সার্বিক বিবেচনা করলে লাবনী,তার স্বামী,স্বামীর বোন ও লাবনীর আত্মীয় কাউকে খারাপ বলা বা তাদের অবস্হান থেকে খুব একটি অন্যায় কেউ করেছে বলা যাবে না

৮। ভুল শুধু এক জায়গায়, কেউই ভাবতে পারেনি এটি একটি মনো-যৌন সমস্যা যা চিকিৎসায় ভালো করা যায়।
জোর করলে বরং পরিস্হিতি আরো জটিল হয়।

*** যৌনতা মানব জীবনে গুরুত্বপূর্ন বিষয়।তাই লজ্জা করে বা পাপ/ নোংরা জিনিস মনে করে এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকলে জীবনে সঙ্কট দেখা দিতে পারে

Monday, November 21, 2016

যাহা বলিব সত্য বলিব:২

বিবেকের কাঠ গড়ায়

(এবিসি রেডিও এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান (জেবিএসবি)-যাহা বলিব সত্য বলিব এর নিয়মিত পরামর্শদাতা হিসেবে অভিজ্ঞতার কিছু অংশ আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে এই বিভাগ)

ঘটনা সংক্ষেপ:

আবেদ(ছদ্ম নাম) বয়স বর্তমানে ২৫।
মোটামোটি স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান।ইন্টারমিডিয়েট পাশ।
সে প্রায়ই ব্রীজের উপর ঘুরে বেড়াতো।
একদিন সেখানে এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় যে ছিনতাই দলের সদস্য ছিল।
আলাপের পর আবেদ অনুপ্রানিত বোধ করেন।

সে ভাবতে থাকে এদের সঙ্গে থাকলে সবাই ভয় পাবে,সবাই তাকে খাতির ও সমাদর করবে।
সে নিজেকে এ ভাবে "হিরো" হিসেবে কল্পনা করতে লাগলো।
ঐ বড় ভাই তাকে টেলিফোনে  পাবনার সর্বহারা দলের এক বিগ বসের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়।
বস তাকে লোভ দেখায় তোমাকে দূরুত বড় লোক বানিয়ে দেবো,তোমার অনেক উন্নতি হবে।তবে আমাদের কথামত কাজ করতে হবে।

আবেদ বললো,বস যা বলবেন সব করবো।

এর মধ্যে আবেদের এক বন্ধু তাকে প্রস্তাব দেয় তার সঙ্গে ঢাকা যেতে,কেননা সে বিদেশ যাবে সে কারনে তাকে টাকা জমা দিতে ঢাকা যেতে হবে।

সে এ কথা তার ঐ সন্ত্রাসী বন্ধুকে বলে।
ঐ বন্ধু ও তাদের লিডার তাকে বলে সে যেন ঐ ছেলের সঙ্গে যায় এবং তার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে লন্চ থেকে রাতের অন্ধকারে থাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেয়( চাদপুরের লন্চে ঢাকা আসার কথা)।

সে এ কথায় রাজী হয়।
লন্চে এসে আবেদ দেখে সন্ত্রাসী বন্ধু আরো একজনকে সঙ্গে নিয়ে লন্চে উঠেছে।
সে ঐ ছেলেকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে অচেতন করে ফেলে ও তার টাকা হাতিয়ে নেয়।
আবেদ পরে ভাবে টাকা তো নিয়ে ফেলেছি তাই মারার কি দরকার।সে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে ঐ সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেয়।তারা তাকে ১০ হাজার টাকা দেয়।

এতেই সে মহা খুশী।
জীবনে এক সঙ্গে এত টাকা সে কখনো কামাই করতে পারেনি।
পরে সে কিছুটা অনুতপ্ত হয়ে সেই বন্ধুকে বলে দেয় যে তারা তার টাকা নিয়েছে এবং এটি সে তাকে ফেরত দেবে।
আবেদনকারী তার মাকে বলে  কাজ পাওয়ার জন্য টাকা ধার নিয়েছিল,সে গুলো খোয়া গেছে।এখন মা যেন ধার করে হলেও সে টাকা তাকে দেয়।
মা সুদে টাকা ধার নিয়ে তাকে দেয়।

পরে ঐ বন্ধু তার মা ও অন্যান্যদের বলে দেয় যে সে তার টাকা ছিনতাই করে নিয়েছে।তাই সে বাধ্য হয়ে ঘর ছাড়ে।

সন্ত্রাসী বন্ধুরা তাকে আশ্রয় দেয় ও সাহস যোগায় যে এটি ছিল তার প্রথম কাজ তাই ঝামেলা হয়েছে।
পরবর্তীতে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ওরা তাকে গ্রীনলাইফ বাসের কাউন্টারে চাকরী জোগাড়  করে দেয়।
তাদের পরামর্শে এক সময় সে সেখান থেকে ২ লাখ টাকা চুরি করে পালিয়ে আসে।
সে টাকাও সে ওদের হাতে তুলে দেয়।তাকে ২০-৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

এ ভাবে সে ৩-৪ টা সফল মিশন করে।

এর মধ্যে সে বিয়ে করে এবং এক সন্তান ও হয়।

ঐ চক্র এবার তাকে শ্বশুড় বাড়ীর লোকদের সরকারী চাকরী দেবার প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বুদ্ধি দেয়।
সে তাই করে এবং ৮০ হাজারের মতন টাকা বাগিয়ে আনে।কথা ছিল ২-৩ মাসের মধ্যে চাকরী দেবে।

চাকরী দিতে না পারাতে সে চাপের মুখে পড়ে।

তখন সে তার সন্ত্রাসী বন্ধুদের বলে তোমরা আমাকে  বড় লোক  বানিয়ে দেবে বলেছিলে,অনেক উন্নতি হবে বলেছিলে, তোমরা কথা পূরন করো।
তখন তারা তাকে পাল্টা হুমকি দেয় যে তুমি অনেক অপরাধ করেছো,বেশী বাড়াবাড়ি করলে তোমাকে ফাসিয়ে দেবো।

তখন সে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করে ও নিজের  মোবাইলের সীম বদলে ফেলে।

এর পর ও তার বড় সন্ত্রাসী হওয়া, ক্ষমতাবান হওয়ার বাসনা রয়ে যায়।

সে ইন্টারনেটে একটি গ্রপের সঙ্গে পরিচিত হয়।

তারা নিজেদেরকে জঙ্গি  আই এস  বলে দাবী করে।
সে ভাবে এবার সে আরো বড় ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে।কিন্তু ঐ চক্র তার কাছ থেকে হাদিয়া হিসেবে টাকা চায় এবং অন্যান্য কার্যকলাপে  তার কাছে মনে হলো যে এটি ভুয়া গ্রপ।

এর পর সে র্যাব এর কাছে যায় ও তার জীবনের সব কথা বলে দেয়ও সে ভালো হওয়ার সুযোগ চায়।।

র্যাব এর লোকেরা তার মোবাইল ঘাটাঘাটি করে বলে ঐ গ্রপ ভুয়া এবং তাকে ভালো হয়ে যাওয়ার কথা বলে ছেড়ে দেয়।

এখন সে সত্যি ভালো হতে চায়।সে তার বউ এর সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করেছে।

আমরা আবেদের অপরাধ জগত থেকে স্বাভাবিক জগতে ফিরে আসাকে স্বাগত জানাচ্ছি  ও তার পরিবারের জন্য  দোয়া করছি

আমার কিছু পর্যবেক্ষন:

১।কৈশোর বয়সে এডভান্চিরিজম,হিরো ইজম একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
কেউ হিরো হতে চায় বড় বিজ্ঞানী হয়ে,বিখ্যাত লেখক,গায়ক,নায়ক বা খেলোয়ার,রাজনীতিবিদ হয়ে।
আবার আবেদের মতন কিছু তরুন হিরো হতে চায় কুখ্যাত সন্ত্রাসী হয়ে।

কেন  আবেদদের রোল মডেল এমন হয়?

আবেদ অনুপ্রানিত বোধ করলো ক্ষমতা পেয়ে অন্যকে ভয় দেখাতে পারবে বলে।

ভয় দেখিয়ে সমাদর,সম্মান, অন্যের সালাম পাওয়ার এই রোল মডেল তারা কি আমাদের সমাজ থেকেই পাচ্ছে না?

আমাদের সমাজে শিক্ষিত,মেধাবী,জ্ঞানী,সৎ, উচ্চ নৈতিকতার মানুষরা কি সবার কাছ থেকে,রাস্ট্র, সমাজ থেকে যথাযথ সম্মান,গুরুত্ব ও মর্যাদা পাচ্ছে?

পদ পদবী,ক্ষমতা,অর্থ,প্রতিপত্তি কি তাদের দখলে না, নাকি তা বিবেক বর্জিত,অসৎ,পা চাটা,চামচা জাতীয় মাস্তান গ্রপের হাতে জিম্মি?

বর্তমান প্রজন্ম নৈতিক উন্নতির চেয়ে বৈষয়িক উন্নতির কথা আগে ভাবে।

সমাজ,রাজনীতি,প্রশাসন,ব্যবসায় কারা উন্নতি করছে?
কারা সামনের কাতারে আছে?

রোল মডেল তারা হবে নাকি অসম্মানিত,উপেক্ষিত,পিছিয়ে থাকা নীতি বাগিশরা হবে?

২।পাবনার সর্বহারা দলের নেতা(?) চাদপুরের প্রতারক চক্রকে নিয়ন্ত্রন করে।
আদর্শবাদের চর্চা করতে গিয়ে, বিপ্লবী পথ ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে প্রায় বেশীর ভাগ আদর্শবাদী দল বা তার অনুসারীরা কেন সন্ত্রাসী পথ বেছে নেয়?

এটি কি সমাজ আদর্শকে গ্রহন না করাতে হতাশা, ব্যর্থতার ফলশ্রতি?

এটি কি বিপ্লবী ক্রিয়া কান্ডের সঙ্গে অনুসঙ্গ হিসেবে প্রাথমিক ভাবে উগ্র পন্থাকে,কিছুটা সন্ত্রাসকে বেছে নেওয়ার পরবর্তী ফলাফল?

বিপ্লবীদের এ দিকটি ভেবে দেখতে হবে।

৩।প্রতারক চক্র যে কত সঙ্গবদ্ধ ও বিচিত্র পন্থায় প্রতারনা,জালিয়াতি করে থাকে এটি তার প্রমান।

বন্ধু থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া,পূর্ব পরিকল্পনা মত নামকরা বাসের কাউন্টারে চাকরীর নামে টাকা লুট,চাকরী দেবার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে সর্বসান্ত করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া- কি না?

এই জালিয়াতি চক্র ঠান্ডা মাথায়, প্রচুর বুদ্ধি খাটিয়ে অভিনব পদ্ধতি আবিস্কার করে মানুষকে প্রতারনার ফাদে ফেলে।

সাধারন মানুষের পক্ষে এমন প্রতারনা ধরা কঠিন।

তাই রাস্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এবং সংবাদ মাধ্যমকে এ বিষয়ে অগ্রনী ভূমিকা নিতে হবে।

যাতে সাধারন মানুষ এ রকম প্রতারনা ফাদে না পরতে পারে।

৪। বিভৎস্য ব্যাপার হচ্ছে সামান্য কিছু টাকার জন্য এত দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে লন্চ থেকে নদীতে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে ও তার বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ কাজ করেনি।

পত্র পত্রিকায়  প্রায়ই আমরা দেখি বন্ধুর মোবাইল ফোনটি নেওয়ার জন্য বা তেমন দামী কিছু(তাদের কাছে কয়েক হাজার টাকার জিনিসই মহা মূল্যবান) জিনিসের লোভে কিছু কিশোর একত্র হয়ে ঐ ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।

লোভ মানুষকে অমানুষ বানায়।

আমরা কি শিক্ষা নিচ্ছি,পাচ্ছি বা দিচ্ছি শিশুদেরকে?

নিজ পরিবারে,আপন সমাজে কিসের হাতছানী আমাদেরকে বেশী টানে?

কোথায় সে উদাহরন যে লোভ,লালসা,কামনা নয় সৎ,সুন্দর,নৈতিক জীবনই অধিক কাম্য?

৫। আবেদ প্রতিবারই নিজে টাকা চুরি করে বা প্রতারনা করে ঐ চক্রের হাতে দিয়ে দেয়।
সে তো ইচ্ছে করলে নিজের অসৎ উপার্জন নিজের কাছে রাখতে পারতো।

সে কেন তাদের ক্রীতদাস হতে গেলো?।

কারন এ রকম অসৎ,বে-আইনী পথে যারা হাটে তারা শক্তি,ভরসা পায় কোন গড ফাদার বা রাজনৈতিক শক্তি থেকে।

তারা নিজেরা হচ্ছে খুবই ভীতু ও দুর্বল।

পিছনের খুটির বলে তারা ক্ষমতার দম্ভ দেখায়।

ঐ মদদ দাতাদের বিরুদ্ধাচারন করে তারা শুধু টিকে থাকতে পারবে না তা নয়,তাদের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যেতে পারে।

আবেদও তার প্রমান।

৬।আই এস সহ মুসলিম জঙ্গী গোষ্ঠীতে কেবল মাত্র আদর্শের কারনে,ধর্মীয়  কারনেই যে সব তরুন যায়,তা নয়।

আবেদের মতন কিছু তরুন ক্ষমতা পাওয়া ও বড় সন্ত্রসী হওয়ার জন্যও এতে যোগ দিতে পারে।

৬।ইন্টারনেটে  বিভিন্ন প্রতারক চক্র রয়েছে তা  আমরা জানি।

কিন্তু আই এস বা ইসলামী জঙ্গি নামে ভুয়া গ্রপও তৈরী হচ্ছে এটি নতুন জানা।
ভেজাল সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে

এটি ভয়াবহ সংবাদ

Tuesday, November 15, 2016

সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল:৭

সন্তান বখে যাওয়া,উচ্ছৃঙ্খল,নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারন প্রতিকার:

পর্ব-১

মা-বাবা ও সমাজের সবচেয়ে বেশী ক্ষতি ও হতাশাজনক অবস্হা হচ্ছে যখন শিশু-কিশোররা অস্বাভাবিক সমাজ-বিরোধী এবং আইন ও নৈতিকতা বিরোধী কার্য কলাপে জড়িয়ে পড়ে।

ঐশীর কথা মনে আছে? 
মোটর সাইকেল কিনে না দেওয়াতে মা-বাবাকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ত সে দিনের।
এ রকম হাজার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।

কিন্তু কেন 
এর প্রতিকার কি

(আমার" শিশু বিকাশ-৩য় খন্ড: অটিজম- মৃগীরোগ,বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা-আচরন সমস্যা-"- বইতে আমি এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন)
এখানে আমি সংক্ষপে ঐ বই থেকে নির্বাচিত কিছু অংশ তুলে ধরবো:
বখে যাওয়া বা আচরন সমস্যা বলতে কি বোঝায়?

সরল ভাবে বললে:
শিশু ও কৈশোর কাল থেকেই ধারাবাহিক ভাবে,অটল ভাবে বার বার এমন কাজ ও আচরন করা যা 

১।অন্যদের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন করে(basic rights of others)  ও

২।সামাজিক আদর্শ,নীতি, রীতিকে ভঙ্গ করে(social norms and rules)।

মোটাদাগে এ ধরনের আচরনকে ৪ ভাগে ভাগ করা যায়:

১।আক্রমনাত্মক আচরন: যা অন্যকে ক্ষতি করে বা ক্ষতির জন্য হুমকিস্বরূপ(aggressive behavior)।

২।সম্পদের ক্ষতি সাধন

৩।প্রচ্ছন্ন আগ্রাসী আচরন(covert aggressive behavior): যেমন-- প্রতারনা,প্রবন্চনা করা,চুরি করা

৪।নিয়ম-রীতি ভঙ্গ করা(rule violation)

সারা বিশ্বেই শিশু কিশোরদের মানসিক সমস্যার মধ্যে এই আচরন সমস্যা সবচেয়ে কমন সমস্যা।

প্রশ্ন হচ্ছে আচরন সমস্যা কখন বলবো?

বেশীর ভাগ শিশুই মাঝে মধ্যে আচরনগত সমস্যা করে থাকে।
মা-বাবারা প্রায়ই ২য় বছরের শিশুকে  "ভয়াবহ,ভয়ঙ্কর" (terrible  two) বলে থাকেন; তিন বছরের শিশুকে "বিভৎস্য,ভয়াল" ( horrible three)  বলে থাকেন।

তাই এটি সামগ্রিক বিকাশের প্রেক্ষাপট থেকে বলতে হবে এবং সেটি যখন লাগাতার হয় ও ধ্বংসাত্মক বা বিপদজনক হয় তখন সেটিকে আমরা আচরন সমস্যা বলতে পারি

কিছু তথ্য:

মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে আচরন সমস্যা ৪ গুন বেশী দেখা যায়,তবে কৈশোরে কমে ২ গুন হয়।

গ্রামের চেয়ে শহরে বেশী হয়

সুবিধে বন্চিত,অধিক জুকিপূর্ন শহরের অভ্যন্তরে,নিম্ন আয়,নিম্ন আর্থ সামাজিক অবস্হানে বেশী দেখা যায়

(ইদানীং ধনী,শিক্ষিত পরিবারেও বেশী দেখা যাচ্ছে।তবে সেগুলো সংবাদ মাধ্যমে বেশী হাইলাইট  হচ্ছে বলে)

এটি কি সামাজিক সমস্যা না মানসিক রোগ?

উত্তর হচ্ছে এটি দু'টিই

এটি সামাজিক সমস্যা কেননা:

সামাজিক সক্ষমতা অক্ষুন্ন থাকা সত্ত্বেও,মানসিক অবস্হা আপাত অক্ষুন্ন থাকা সত্ত্বেও, ব্যক্তি সামাজিক রীতি-নিয়ম মেনে চলতে ব্যর্থ হন।তাই এটি সামাজিক ভাবে নির্ধারিত।

এটি মানসিক রোগ ও কেননা:

আচরন সমস্যার পিছনে বংশ ধারা ও বায়োলজিক্যাল  কারন গুরুত্বপূর্ন।তাছাড়া এটি ঔষধ ও মনস্বতাত্বিক চিকিৎসায় ভালো করা সম্ভব।

৩টি উপবিভাগ রয়েছে:
১।আচরন সমস্যা শুধু নিজ বাসা/বাড়ীতে দেখা যায়,বাইরে তারা ভদ্র( গত রোগ কাহিনীর দানব সন্তান এ ধরনের)

২।অসামাজিক আচরন সমস্যা(unsocialized conduct disorder)  :এ ক্ষেত্রে তাদের কোন বন্ধু থাকে না

৩।সামাজিক আচরন সমস্যা( socialized):এ ক্ষেত্রে সঙ্গীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকে।

লক্ষন সমূহ:

DSM- অনুসারে:

ক।মানুষ ও প্রানীর প্রতি আক্রমনাত্মক আচরন( aggression to peoples and animals) :

১।প্রায়ই সঙ্গী সাথীদের উক্তত্য করা;উপহাস করা;হুমকি দেওয়া;ভয় দেখিয়ে বশে আনার চেষ্টা করা।

২।প্রায়ই মারামারিতে লিপ্ত হওয়া

৩।তেমন অস্ত্র ব্যবহার করা  যা অন্যের শরীরে গুরুতর ক্ষতি সাধন করতে পারে(ব্যাট,ইট,ভাঙ্গা বোতল,ছুরি,বন্দুক)

৪।মানুষের সহিত বা প্রানীর প্রতি শারিরীক ভাবে নিষ্ঠুর, নির্দয় আচরন করা

৫।চুরি,ছিনতাই,ডাকাতি করা

৬।কাউকে যৌনতায় অংশ গ্রহনে জোর করে বাধ্য করা

খ।সম্পত্তির ধ্বংস সাধন করা:

১।ক্ষতি করার জন্য ইচ্ছে করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া

২।ইচ্ছাকৃত ভাবে অন্যান্য উপায়ে সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করা

গ।প্রতারনা,প্রবন্চনা,বা চুরি করা:

১।অন্যের বাসায় ঢুকে পড়া ও চুরি করা

২। কিছু পাওয়ার আশায় বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রায়ই মিথ্যে কথা বলা

৩।ভেঙ্গে ঢুকে না পরেও অন্য ভাবে চুরি করা
,জালিয়াতি করা,প্রতারনা করা

ঘ।রীতি-নিয়ম গুরুতর ভাবে লঙ্গন করা:

১।১৩ বছরের পূর্বে থেকেই মা- বাবার নিষেধ সত্বেও রাতে বাইরে থাকা

২।কম পক্ষে ২ বার বাসা থেকে পালিয়ে যাওয়া ও বাইরে রাত কাটানো

৩।১৩ বছরের পূর্ব থেকেই প্রায়ই স্কুল ফাকি দেওয়া বা স্কুল পালানো

ঙ।আচরন সমস্যা তার সামাজিক,একাডেমিক বা পেশাগত জীবনকে গুরুতর ভাবে ব্যাহত করে

চ।উপরোক্ত লক্ষনের মধ্যে  ৩ বা ততোধিক লক্ষন থাকতে হবে


পরবর্তী পর্বে: শ্রেনীভেদ,কারন ও প্রতিকার

Thursday, November 10, 2016

রোগ কাহিনী/রোগী কাহিনী:৮

কোন দানব প্রজন্ম তৈরী করছি আমরা?

মোটর সাইকেল না দিলে তোমাদের ঐ ছেলের মতন পুড়িয়ে মারবো:

আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে কিছু দিন আগে এক দানব সন্তান নতুন মডেলের মোটর সাইকেল কিনে না দেওয়াতে মা-বাবাকে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে?

আমাদের আজকের রোগ কাহিনীর এই "সু সন্তানের " কাহিনী তার চেয়ে জগন্য এবং তার দানবীয় নৃশংসতা শুরু এরও অনেক আগ থেকে

কাহিনী সংক্ষেপ:

কামরান(ছদ্ম নাম) বয়স ২৫
২০১০ এ এসএসসি পরীক্ষার  পূর্বে বাবার কাছে মোটর সাইকেল চায়(বুঝতেই পারছেন এ ঘটনা ঐ ছেলের ঘটনার অনেক আগের ঘটনা)।

তার মানে পুড়িয়ে মা-বাবা মারার বহু ছেলে আমাদের ঘরে ঘরে আছে, শুধু হেড লাইন হচ্ছে না সত্যি করে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা এখনো হয়নি বলে।
বাবা আশ্বস্ত করেন এ+ পেলে মোটর সাইকেল কিনে দিবেন।
যথারীতি পুত্রধন এ+ পেতে ব্যর্থ হন।তাই মোটর সাইকেল দেওয়া হয়নি।

রাজপুত্র এতে খুব ক্ষিপ্ত হন।তিনি ঘরে ভাংচুর করেন। তিনি নতুন আবদার তুলেন মোটর সাইকেল না দিলে তিনি আর পড়াশোনা করবেন না।
বাবা এবার খুব কঠোর হন,বলেন ভাংচুর যত করো মোটর সাইকেল পাবে না।

রাগ করে আমাদের সোনার ছেলে ১ বছর কোন লেখা পড়া করেনি।

কিন্তু তাকে বোঝানোর চেষ্টা অব্যাহত আছে।সবাই বলছে আব্বু পড়াশোনা শুরু করো এক সময় তুমি মোটর সাইকেল পাবে।

ঘুষ দেওয়ার প্রতিশ্রতিতে ওনার মন নরম হয়।তিনি পড়াশোনা শুরু করেন।

কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই তিনি বেকে বসেন।পড়াশোনায় উনার মন বসে না।
তিনি আবদার করেন তার কলেজ চেইন্জ করে দিতে হবে।
তথাস্ত, তাই হলো।সেখানেও এক ম্যাডামের সঙ্গে গন্ডগোল বেধে যায়।
তিনি এসএসসির টেস্ট এ এলাউ হননি।
অনুরোধ করাতে আরো দু'বার সুযোগ দেওয়া হয়।কিন্তু উনি কৃতকার্য হতে পারেননি।ফলে পরীক্ষা দেওয়া হয় না।এর পরের বছর ও তিনি পারলেন না।

এবার তিনি  তার বাবাকে বলে প্রিন্সিপ্যালকে মারতে হবে(বাবা যেহেতু  পুলিশ প্রশাসনের)। তার ভাষায় তোমার ক্ষমতা আছে তাদের শায়েস্তা করার তুমি করছো না কেন?
অসহায়,নিরীহ বাবা গালমন্দ খেতে থাকেন।
এর পর থেকে সে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে।
একমাত্র বোন তাকে গালিগালাজ, মারধর করে।
বাবাকে বাবা বলতে অস্বীকার করে।

এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হয়, কিন্তু মেয়ে রাজী না।
তার আবদার ঐ মেয়েকে এনে দাও না হয় গাড়ী দাও

চাচার সঙ্গে বাবার দ্বন্ধ,তাই বাবাকে বলে চাচাত ভাইকে জেলে দাও

বাবা এ সব না করলে তাকে গালি দেয়,লাথি মারে,ঘুষি মারে,গলা চেপে ধরে মেরে ফেলবে।

ইন্টারনেট ঘেটে গালি বের করে,যাতে সবাইকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে পারে।

এরই মাঝে মোটর সাইকেল না পেয়ে মা-বাবাকে পুড়িয়ে মারার ঐ ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে আসার পর সে বলে, তোমাদেরকেও এমন ভাবে মারা হবে।

সে আর্মির পোষাক পরে,বুলেটপ্রফ জ্যাকেট পরে,পিস্তলের খাপ, বুট জুতা পরে  এমন ভাবে  থাকে যেন সে যুদ্ধে যাচ্ছে

ইতিমধ্যে বাসার টিভি,ফ্রিজ,ট্যাব,মোবাইল সব ভেঙ্গে ফেলেছে।

তবে সে নেশা করে না
সব অত্যাচার তার ঘরে, বাইরে সে ভদ্র।

এখন তার দাবী
গাড়ী দাও,মোটর সাইকেল দাও,ঐ মেয়েকে এনে দাও,আমার হারানো ৬ বছর এনে দাও।

তা নাহলে এক দিনে মারবো না,কষ্ট দিয়ে দিয়ে তিলে তিলে মারবো
(কিন্তু তার বাবা ও বোনের আশঙ্কা যে কোন সময় সে তাদের খুন করে ফেলবে)।

কাহিনী আপাতত শেষ

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কি ভাবে নিজ ঘরে এমন দানব গড় উঠে?

কি ভাবে তোমার বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে?

( পরবর্তী লেখায় তা নিয়ে আলোচনার আশা রাখি)

Thursday, November 3, 2016

সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল- ৬

নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে জিতে যাচ্ছি স্যার

এটি ছিল কাউন্সিলিং থাকা নিজকে বদলে ফেলা এক সফল রোগিনীর আত্ম-তৃপ্ত ও আত্ম বিশ্বাসী  গর্বিত উক্তি

অনেকেই হয়ত জানেন, আমাদের সিংহভাগ রুগীকে শুধু ঔষধ চিকিৎসা দিয়ে পূর্ন আরোগ্য লাভ সম্ভব না।
আর রোগকে মূল থেকে উৎপাটিত করতে  হলে রুগীর চিন্তা,মনন,দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হয়।

এর জন্য সাইকোথেরাপি বা কাউন্সিলিং এর বিকল্প নেই।
কাউন্সিলিং ও সাইকোথেরাপির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে(এখানে সেটি বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই)।
আবার সাইকোথেরাপিরও রয়েছে নানা ভাগ,নানা প্রকারেরর।

এর মধ্যে সিবিটি(কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি) হচ্ছে সারা বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সব চেয়ে কার্যকর সাইকোথেরাপি,বিশেষ করে ডিপ্রেশন চিকিৎসায়।

আমি সিবিটির একনিষ্ঠ ভক্ত।

 মূলত সংক্ষিপ্ত, ঘনবদ্ধ ও লাগসই( brief, condensed,case and context appropriate)  সিবিটি আমি রোগী চিকিৎসায় প্রয়োগ করে থাকি।
(চেম্বারে লম্বা সময় নিয়ে সাইকোএনালাইসিস পদ্ধতি ব্যবহার বাস্তব সম্মত নয়)

রোগ কাহিনী:রোগ কাহিনী নামে আমাদের একটি স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে।এখানে রোগকাহিনী গুরুত্বপূর্ন নয়।

কিভাবে থেরাপি রুগীকে বদলে ফেলে তার দৃষ্টান্ত দেখানোর জন্য এই ডায়রী লেখা।
বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে তিনি আমার চেম্বারে আসেন।ইতিহাস নিয়ে যা জানা গেলো:

রোগীনি একটি কলেজের সহকারি  অধ্যাপক।
তার ভাষায়,স্যার আমি ও আমার পরিবার সফট মাইন্ডেড,উচ্চ শিক্ষিত।
বাবা ছিলেন কলেজের প্রিন্সিপ্যাল, অন্যান্য আত্মীয়রাও উচ্চ পদস্হ ও উচ্চ শিক্ষিত।
আমরা বই পড়া,সাংস্কৃতিক চর্চায় বেশী আগ্রহী।অন্যদিকে স্বামী ব্যবসায়ী, তবে তিনি আমার অবস্হা বুঝেন।
কিন্তু আমার শ্বশুড় বাড়ীর প্রায় সবাই রূড,হার্ড ও বেপরোয়া।তারা আমাকে,আমার শিক্ষাকে ত কোন দাম দেয় না-ই,উপরোন্ত এ নিয়ে টিটকারী করে।
তার(স্বামীর) বোনেরা আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে,উপহাস করে,প্রায়ই আমার সঙ্গে বেয়াদবী করে। তারা এমন এমন কথা ও আচরন করে যে সারাক্ষন আমার মনে রক্ত ক্ষরন হতে থাকে়।
আমি যন্ত্রনায় বিদ্ধ হই।স্বামীকে বললে তারা সব এক জোট হয়ে তা অস্বীকার করে ওআমাকেই অপরাধী,দোষী সাবস্ত্য করে।
আমি এদের সঙ্গে পেরে উঠছি না স্যার।
সামাজিক ও পারিবারিক চাপের কারনে সংসারও ত্যাগ করতে পারছি না।তবে স্বামী সব সময় সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু আমার মন-যন্ত্রনা কমছে না।

তিনি বলেন টেনশনে আমার ঘুম হয় না,নিজকে ছোট মনে হয়।মনে হয় আমি হয়ত শিক্ষিত কিন্তু বুদ্ধি,দক্ষতা,ব্যক্তিত্বে  আমি ঐ অল্প শিক্ষিত মেয়ে গুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে।
তারা সুখী,সাহসী ও সবার প্রিয়।
অথচ আমি সঙ্কোচিত,বিব্রত,অসুখী ও সবার কাছে অপ্রিয়।এমনকি আমার মা বাবার কাছেও।
তারাও বলে তোমার ঘাটতি আছে,সমস্যা আছে তা না হলে এমন হবে কেন?

স্যার ঐ সব বিদূপাত্মক কথা ও আচরন আমি ভুলতে পারি না।সারাক্ষন অস্হির থাকি,ভয়ে থাকি

টেনশন আসলেই বুক চেপে আসে,মন চুপসে যায়।

ঔষধ সহ সাইকোথেরাপির ডেট দিয়ে দিলাম।
৪-৫টি থেরাপিতেই তিনি আরোগ্য লাভ করলেন।

গতকাল এসে তিনি তার ঐ প্রত্যয় দীপ্ত উচ্চারন করলেন।

চিকিৎসকের প্রধান গর্ব,শ্রেষ্ঠ  পুরস্কার ও তৃপ্তি রোগীকে রোগ থেকে পূর্ন মুক্তি দিতে পারা।
একমাত্র সাইকেথেরাপি যদি সফল হয়, তখনই মাত্র এমন কৃতিত্ব একজন সাইকিয়াট্রিস্ট পেতে পারেন।।

বিনীতভাবে হলেও যথেষ্ট তৃপ্তির সঙ্গে বলতে পারি এমন গর্ব, তৃপ্তি আমি অনেকবারই পেয়েছি।

তারই একটি উদাহরন আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি।

আমি বললাম,কিভাবে জিতে যাচে্ছন?।উদাহরন দিন।
তিনি বললেন গত সপ্তাহে এক পারিবারিক ইনফর্মাল মিটিং এ আমি কায়দা করে,সবার সামনে আমাকে নিয়ে চরম অপমানজনক কথার প্রসঙ্গটি উঠাই (অনেক অপমানের একটি) ও বলি, যদি অন্য কেউ  তেমন কথা বলতো আমি সরাসরি তাকে জোরসে চড় মেরে দিতাম।
ঐ মেয়েও সেখানে ছিল। লক্ষ্য  করলাম সে বিব্রত ও সংকুচিত হয়ে চুপসেে গেল(মুরুববীরাও ছিল)।এক পর্যায়ে তারা আমার কাছে দুংখ প্রকাশও করে।

এই প্রথম বার তিনি এসারটিভ (  assertive)আচরন করতে পেরেছেন, ফলে তার ক্ষোভ,যন্ত্রনার উপশম হয়।
আমরা মূলত নিজেদের অধিকার আদায়ে,মতামত প্রকাশে  ৩ ভাবে প্রতিক্রিয়া করে থাকি।

১।আক্রমনাত্মক ভাবে(aggressive) - নিজের মত ও ইচ্ছা জানাতে, নিজের সুযোগ ও অধিকার আদায়ে কেউ কেউ  আক্রমনাত্মক আচরন করে  থাকে।
২। আত্ম সমর্পনমূলক( submissive) :
কেউ কেউ উল্টো রকমের।তারা নিজের মত অভিমত প্রকাশে বা নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ও আত্ম সমর্পনমূলক আচরন করে থাকেন।
তারা নিজকে গুটিয়ে রাখেন,সংকুচিত থাকেন,লাজুক-ভীতু প্রকৃতির হন।ফলে অন্যরা তাদেরকে মাড়িয়ে যায়,তুচ্ছ করে,অপদস্ত করে বাতিলের খাতায় ফেলে রাখে।(যেমন আমাদের আজকের রুগিনী)।

৩।দৃড়, তবে ভদ্র ভাবে নিজের মত প্রকাশ( assertive) :
এটি হচ্ছে উত্তম পদ্ধতি,ঐ দু'এর মাঝখানের অবস্হান।
এখানে ব্যক্তি সাহস ও দৃড়তার সহিত অথচ মার্জিত,ভদ্র ভাবে নিজের মত তুলে ধরেন ও অধিকার আদায় করে নেন।অন্যকে অসম্মান না করেও নিজের স্বাধীন মত প্রকাশে তারা কুন্ঠাহীন

আমাদের রুগিনী জীবনে এই প্রথম বারের মতন নিজের অভিযোগ,ক্ষোভ এমনকি ক্রোধ ও বাদানুবাদ না করে,ঝগড়া ফ্যাসাদ না বাধিয়ে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন।এতে তার ক্ষোভ,যন্ত্রনার লাঘব ঘটে।তিনি আত্ম বিশ্বাস ও আত্ম সম্মান বোধ ফিরে পান।তার মন অটোমেটিক প্রশান্তি লাভ করে,তিনি ভিতর থেকে রিলিফ ফিল করেন।

২য় উদাহরন জানতে চাইলে তিনি বললেন,গতকাল তার বস(প্রিন্সিপ্যাল) ) সভায় থাকায় তিনি  আগে আগে বাসায়  চলে আসেন।
বাসায় আসার পর  তার ভয় করতে লাগলো তাকে না দেখে বস রেগে যেতে পারেন।

তিনি বলেন তখন আমি নিজকে বললাম যদি তেমন হয় ও আমাকে জিজ্ঞেস  করেন, তাহলে বলবো শরীর খারাপ হওয়াতে চলে আছি।
এমনটি মনকে বলার  সঙ্গে সঙ্গে  উনার মনের ভীতি,অস্হিরতা, টেনশন নিমিষে চলে যায়।

আমি ব্যাখ্যা করি যে বেশীর ভাগ উদ্বেগ-টেনশনের কারন হচ্ছে  মনের ভিতর জানা/অজানা আশঙ্কা,হুমকির বোধ কাজ করা।উনার বস নাখোচ হলে,বিরক্ত বা  ক্রোধান্বিত হলে  উনার উপর হয়রানি হবে এই আশঙ্কাই উনার উদ্বেগের মূল কারন ছিল।
যেই মাত্র তিনি তার মনকে  এই বলে আশ্বস্ত করতে পারলেন যে উনার অসুস্হতার কথা শুনলে তিনি আর রাগ করে থাকবেন না, তখনই উনার মন থেকে দুঃশ্চিন্তার পাথর নেমে গেল।
তিনি রিলিফ ফিল করলেন।

চিন্তা>অনুভূতি/আবেগ>আচরন

উপরের চার্টটি লক্ষ করুন:
আমাদের চিন্তা আমাদের আবেগ/অনুভূতির উপর প্রভাব ফেলে;
আবার অনুভূতি আমাদের সার্বিক আচরনকে প্রভাবিত করে।
আর আচরন নির্ধারন করে আমরা সুখী হবো না অসুখী হবো;সফল হবো না অসফল হবো;সম্পর্ক ভালো থাকবে না মন্দ হবে।

তাই  নেতিবাচক,অকার্যকর,অশুভ  অসুস্হ চিন্তাকে বদলে ফেলে যদি বিকল্প ইতিবাচক, কার্যকর,কল্যানমূলক মূলক সুস্হ চিন্তা মনকে দিতে পারি তাহলেই জীবন বদলে যাবে
যেমমটি ঘটেছে আমাদের রুগিনীর ক্ষেত্রে।

সাইকোথেরাপির মূল লক্ষ্য হচ্ছে রুগী যাতে নিজ সক্ষমতায় নিজকে ভালো রাখতে পারে সে রকম দক্ষ করে তাকে গড়ে তোলা।
তিনি এখন থেকে তেমনটি পারবেন বুঝতে পেরে আমার মন গর্বে ও আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো।