Wednesday, October 31, 2018

সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল -২৮ -ঃস্যার বইটি পড়ে মাত্র ২০ দিনে ১০ বছরের অমানষিক যন্ত্রনা লাঘব হয়েছে, আমি এখন নতুন মানুষ


আজ জানাতে চাই একটি  "ভাল বই" অনেক সময় কিভাবে "শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক " হিসেবে ও কাজ করতে পারে।

মানসিক সমস্যা বা রোগ চিকিৎসায় ঔষধ লাগে বা কাউন্সিলিং/সাইকোথেরাপি।

কিন্তু নিছক একটি বই পড়ে মাত্র ২০ দিনে অনেক অভিজ্ঞ মনোচিকিৎসকের সাইকোথেরাপির চেয়ে অনেক ভাল ফলাফল হলে সেটা অবশ্যই শ্লাগার বিষয়, গৌরবের বিষয়।

আর সে বই যদি হয় নিজের তাহলে সে আনন্দ, গৌরব আর তৃপ্তি হয় অসীম।

আমি গর্বিত, সম্মানিত, সফল ও তৃপ্ত  জীবনের প্রায় সকল দিক থেকে
(বিশ্বাস করি পরম করুনাময় আল্লাহ তালার অশেষ রহমত ছাড়া এমন সৌভাগ্য বান কম লোকই হতে পারে। কার দোয়ায় বা কোন পূন্য গুনে স্রষ্টার এরকম অনুগ্রহ  পেয়েছি জানি না।তবে অসংখ্য রোগী ও তাদের অভিভাবকদের প্রীতি, ভালোবাসা ও দোয়া যে ছিল, আছে, তা মর্মে মর্মে অনুভব করি)। 

চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের কাছ থেকে যে কৃতজ্ঞতা, সম্মান, খ্যাতি পেয়েছি তার ছোট্ট একটি লিস্ট দিলেও অনেকে ভাববেন, এটি আত্মপ্রচার, আত্ম-অহমিকা।

(তবে আমার যে কোন রোগী /তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে গোপনে এর প্রমাণ খুজে নিতে পারেন)।

পরিমাণে বহু রোগী দেখি তা হয়তো নয়,তবে যে কয়জন রোগী দেখি তার গুনগত মান বিচারের ভার ঐ রোগী ও তাদের অভিভাবকদের।

লেখক হিসেবে, চিকিৎসক হিসেবে যে সম্মান,প্রশংসা পেয়েছি /পাচ্ছি , সেটি যত না আমার যোগ্যতা ও কৃতিত্বের জন্য
তার চেয়ে  বেশি  এদেশের রোগী, পাঠকদের  বড় মন
ও ঔদার্যের  কারনে।

এমনকি আপনদের দোয়ার আমার বই গুলো ও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে, বিশেষ করে আত্ম উন্নয়ন  ও আত্ম নির্মাণ বিষয়ক বই " মন ও মানুষ "।
প্রচুর পাঠক /পাঠিকা বইটির অকুন্ঠ প্রশংসা করেছে। তাদের জীবন বদলে দেওয়া একটি বই বলেও উল্লেখ করেন।

কিন্তু এই বই টি পড়ে মাত্র ২০ দিনে মানসিক সমস্যা গ্রস্ত কোন ব্যক্তি তার দীর্ঘ ১০ বছরের অমানষিক কষ্ট থেকে মুক্ত হবেন এবং কঠিন তবে সফল সাইকোথেরাপি " সিবিটি"এর (কগনেটিভ -বিহেইভিয়ার থেরাপি)  মূল নীতি এই বই থেকে শিখে নিয়ে, নিজে এমন সফলতার সহিত প্রয়োগ করতে পারবে, সেটি ছিল অবিশ্বাস্য।

আসুন দেখি মাত্র ২০ দিনে এই বই পড়ে তিনি কতটুকু তার চিন্তা, বিশ্বাস, দৃষ্টি ভঙ্গি বদল করতে পেরেছেন।

১। আগে প্রায়ই রেগে গিয়ে বাচ্চাদের মারতাম-এখন মনে হয় ওদের ছোট্ট অপরাধকে এতোদিন বড় অপরাধ মনে করে এমনটি করতাম।

এবিসি মডেল ব্যবহার করে বুঝলাম আমার ধ্যান ধারনায় অনেক ভুল ছিল।

অনেক জীবন জটিলতার কারনে মন হতাশ,উদ্বিগ্ন থাকতো, তাই বাচ্চাদের ছোট খাট ক্রুটি দেখেই রেগে যেতাম।

এখন তাদের কাছে ডাকি,আদর করি- তারা অবাক হয়,বাবা এমন বদলে গেল কিভাবে? 

ওদের দাদীর সামনে দুই ছেলেকে দুদিক থেকে জড়িয়ে বলি  মা দেখো, আমার একদিক ২০০ কোটি টাকার সম্পত্তি, অন্য দিকেও ২০০ কোটি টাকার সম্পত্তি - মোট ৪০০ কোটি টাকার সম্পত্তি আমার( মা এগুলো দেখে মৃদু হাসে)।

২। আগে কেউ গান করলে বিরক্ত হতাম,রেগে যেতাম।
এখন ভাবি গান তো ভাল জিনিস, আর আমার ভাল না লাগলেও যে গাইছে তার তো ভাল লাগছে। এতে আমার সমস্যা কি?

৩। ১ বছর আগে এক লোক ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। এর জন্য তার পিছনে ঘুরতে ঘুরতে টাকা তো পাইনি বেড়েছে যন্ত্রনা,কষ্ট, হতাশা।

এখন ভাবি আমি তো বুঝতেই পারছি টাকা পাবো  না, খামোখা এটার পিছনে না  ছুটে  নিজের কাজে মনোযোগ দিলে অনেক টাকা লাভ হতো, এতো মনোযন্ত্রনা ও পেতাম না।

এরকম ভাবার পর মনটা অনেক হাল্কা হয়ে যায়

৪।   আমার মন এত দিন শুধু  মন্দ দিকগুলো, ব্যর্থতার স্মৃতিগুলোর দিকে চলে যেতো।

কেউ যখন কোন অঙ্ক ১০ বার অনুশীলন করে ১১তম বার তার কাছে ঐ অঙ্ক অনেক সহজ মনে হবে। কেননা আগের ১০ বারের স্মৃতি তাকে সাহায্য করে।

তেমনি আমি বার বার নেতিবাচক চিন্তা করতাম বলে, অতি সহজে আমার মনে নেতিবাচক স্মৃতি গুলো বেশি বেশি চলে আসতো।

স্যার এখন আপনার কাছ থেকে থেরাপি নিলে নিশ্চয়ই ইতিবাচক চিন্তা,স্মৃতিগুলো একই কারনে সহজে ও বারবার আমার মনে আসতে থাকব?
এতে নিশ্চয়ই আমি আরো দুরুত ভাল হয়ে যাবো।

৫। স্যার আপনার বইটি পড়ে মাত্র ২০ দিনে আমার ১০ বছরের অমানষিক যন্ত্রনার অনেকটা লাঘব হয়েছে। এখনো শারিরিক কিছু সমস্যা রয়ে গেছে।

আমি এখন জানি এগুলো ও মানসিক কারনে। আপনি এগুলো ও ভাল করে দিন।

আমার দৃড় বিশ্বাস এই ১০ বছরের ক্ষতি আমি ইনশাল্লাহ কাটিয়ে উঠতে পারবো।

# রোগীর এই আত্ম-উপলব্ধিগুলো কারো কাউন্সিলিং/সাইকোথেরাপিির ফল নয়।ফেইসবুকে আমার বইয়ের পরিচিত পেয়ে তিনি অনেক চেষ্টা তদ্বির করে "মনও মানুষ " বইটি সংগ্রহ করে পড়েন।২০ দিন পর অনেক কষ্টে আমার ঠিকানা জোগাড় করে চেম্বার ও আসেন

এসে প্রথম দিনেই তিনি এই বই পড়ে কি উপকার পেয়েছেন তা বলছিলেন( আমার কোন প্রকার চিকিৎসা দেওয়ার পূর্বেই)।

আমি কি ধরনের উপকার তার উদাহরণ দিতে বললে তিনি উপরোক্ত "আত্ম-উপলব্ধির" কথা গুলো আমাকে শোনান

-যা আমাকে আনন্দিত,গর্বিত শুধু করেনি, বিস্মিত ও করেছি। একারনেই সে অভিজ্ঞতা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম ( ওনার পুরো রোগ কাহিনী পরে দেবো)

Monday, October 29, 2018

রোগ কাহিনী -৩৬ঃবিরল রোগ-বহুরূপী ব্যক্তিত্ব ( multiple personality disorder)

কাহিনী সংক্ষেপঃনাদিয়া,বয়স ১৭,দশম শ্রেনীর ছাত্রী।
সে একটু আহ্লাদী ধরনের।
ফুপা,খালাতো বোনদের কাছে ঘন ঘন যেতে চায়।পড়াশোনার চেয়ে হই হুল্লোড় ও আড্ডা মেরে মজা পায় বেশি।
তাই বাসা থেকে তাকে বাধা দেওয়া হয়।সে অল্পতেই রাগ-অভিমান করে,দরজা বন্ধ করে,না খেয়ে থাকে। অনেক সাধাসাধির পর অভিমান ভাঙ্গে।
ইদানিং পরিবার থেকে তার উপর চাপ বেড়ে যায়।তার ভাই বলে ছাদ থেকে নীচে ফেলে দেবো,মা বলে ঘরের বাইরে আর যাওয়া যাবে না।

৮ দিন আগে হঠাৎ মাথা ঘুরে সে সেন্সলেস হয়ে পরে।তাকে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয় ও পরদিন বাসায় ফিরে।

আসার কয়েক ঘন্টা পরই আবার তার বুকে চাপ লাগে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আছে,কে যেন বুকে পাড়া দিচ্ছে - এভাবে আবারো সেন্সলেস হয়ে পরে।জ্ঞান ফেরার পর বলে মাথা জ্বলছে, মাথা ব্যথা করছে।

এর কিছু ক্ষন পর চুপচাপ হয়ে যায়, চোখ দিয়ে পানি পরে,ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

এরপর থেকে সে কয়েক ঘন্টা পরপর ভিন্ন ভিন্ন  ব্যক্তির মতন  আচরণ করতে থাকে।

যেসব ব্যক্তির রূপ তার মধ্যে দেখা দেয় সেগুলো হলোঃ

১ খুশবোঃ
এটি তার মূল চরিত্র (তার ডাক নাম)। কিন্তু অতি স্বল্প সময় সে এই আসল রূপে থাকে (১০-১৫ মিনিট) ।

এ সময় সে তার স্বাভাবিক যে আচরণ তা করে থাকে এবং অন্য ব্যক্তির রূপ গ্রহণ করে তা মনে করতে পারে না।

২। আপনঃ
এটি তার ছেলে রূপ।তখন সে সবাইকে তুই করে বলে(তুই বস,আমার সঙ্গে দুষ্টুমি করবি না ইত্যাদি) ।
তখন সে ছেলেদের ভয়েসে কথা বলতে চেষ্টা করে ও আদেশ,উপদেশ দিয়ে থাকে। এই রূপ ৪-৫ ঘন্টা থাকে।

৩। রিমজিমঃ
এটি তার নর্তকী ও দেবী রূপ।সে বিভিন্ন মন্দিরের কথা বলে,ত্রিশূলের মতন ভ্ঙ্গি করে থাকে যেন শয়তান বধ করতে দেবী দাড়িয়ে আছে।

সে তখন নাচে,গান গায়।এই রূপ ২-৩ ঘন্টা থাকে।এ অবস্থা থেকে তার ভাই যদি বলে খুশবুকে এনে দাও সে তখন ওজু করে ও মুহূর্তে খুশবু হয়ে গিয়ে বলে ভাইয়া দেখো খুশবু এসেছে, খুব ক্ষিদে পেয়েছে, কিছু খেতে দাও।

৪। দুঃখ ঃ এটিও স্বল্প সময় থাকে। এ সময় সে শুধু কাদতে থাকে।

৫।সখিনা বিবিঃ
এ সময় সে প্রেগন্যান্ট মহিলার মতন আচরণ করে, যার বাচ্চা তার শ্বশুর শ্বাশুড়ি পেটে থাকতে মেরে ফেলছে।

৬ বেবী (শিশু রূপ)ঃ
আমার চেম্বারে যখন তারা আছে তখন সে এই রূপ নিয়ে আছে।
সে নাকি বেবী। শিশুদের মতন কথা বলে, চন্চলতা দেখায়।বলে আমি এবিসি শিখছি, অনেক নামতা পারি। আমাকে বলে তোমার বাসায় আমাকে নেবে?

এই বিভিন্ন ব্যক্তির রূপ ধারন পর্যায় ক্রমে হতে থাকে।

তার চিকিৎসার জন্য হুজুরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।হুজুর বলে জ্বীনের প্রভাব আছে এবং তিনি ঐ জ্বীনকে "বোতল বন্ধি" করতে চান।

কিন্তু জ্বীন বলে আমি আসবো না,আমি খুশবুর বোন।তার থেকে আমাকে আলাদা করলে খুশবুর ক্ষতি হবে।

এরপর আরেক হুজুর জ্বীন বন্ধি করে তবে বলে তাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখান,এর মানসিক রোগ হয়েছে।

ঐ হুজুরের কথায় তারা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে আমার চেম্বারে আছে।

এই কেইস হিস্ট্রি থেকে কি শিখলাম ঃ

১। হিস্ট্রিয়নিক পার্সোনালিটি যাদের তাদের এরকম রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। (খুশবুর মধ্যে এর অনেক লক্ষণ রয়েছে) ।

২। অপরিপক্ব ব্যক্তিত্ব যাদের তারা ও অধিক ঝুঁকি পূর্ণ (বয়স অনুপাতে ও খুশবু অনেক অপরিনত)।

৩। তথাকথিত জ্বীন-ভুতে ধরা রোগী সবাই মানসিক /ব্রেইনের রোগী।

ইদানিং জ্বীন তাড়ানো হুজুরাও তা বুঝতে শিখেছে।
তাই তারা চিকিৎসার নামে জ্বীন তাড়িয়ে ও বলে জ্বীন তাড়িয়ে দিয়েছি, সব ঠিক হয়ে গেছে তবে" একটু বাকি " আছে সেটি মানসিক ডাক্তারকে দেখান।

৪। একারনে বর্তমানে আমরা অনেক এরকম রোগী পাচ্ছি যাদেরকে হুজুররা আমাদের কাছে রেফার করে থাকে।

৫।পরিবার বা অন্যরা  ঐ রোগের লক্ষন প্রকাশ পেলে বেশি মনোযোগ বা যত্ন দিয়ে থাকে যা ঐ রোগকে দীর্ঘায়িত করে।

একে আমরা বলি "সেকেন্ডারি গেইন" বা সোশ্যাল রি-ইনফোর্সমেন্ট।

অসুস্থ আচরণকে ইগনোর করে ,সুস্থ আচরণকে " পুরস্কৃত " করতে হবে- তাহলেই রোগী দুরুত আরোগ্য লাভ করবে।

৬। মানসিক দ্বন্দ্ব বা চাপের যে কষ্ট, অস্বস্তি সেটি থেকে "সাময়িক মুক্তি" পেতে ব্রেইন এ ধরনের "অবস্থা " তৈরি করে।

৭।তবে এগুলো রোগীরা ইচ্ছে করে তৈরি করে না।তাই তাদের কোন রোগ নাই, বানিয়ে বানিয়ে করছে ভাবা অন্যায় হবে

৮। এই রোগের নাম multiple personality disorder - যা   dissociative disorder এর একটি রূপ।

Monday, October 22, 2018

সাইকিয়াট্রিস্ট এর জার্নাল -২৮ঃসৈয়দ হক বচন

বচন-১ঃস্বর্গের পথ নির্জন
(দল করে স্বর্গে যাওয়া যাবে না,একা ও নির্জন পথেই যেতে হবে)

বচন-২ঃযতদিন যাবে তত ভৃত্য জন্ম নেবে

(স্বাধীন দেশে কি  দিন দিন "ভৃত্য" সংখ্যা বাড়বে, স্বাধীন, সাহসী মানুষ নয়?)

বচন-৩ঃএ যেন এক প্রতিযোগিতা চলে আমাদের ভেতরে - আমরা কে কত খারাপ দিক আবিস্কার করতে পারি বাঙ্গালী জনের ও বাঙালি জাতির.....

.( তার বিপরীতে)  চ্যালেঞ্জের মতন আহ্বান করি

"আসুন তবে দেখা যাক আমাদের বিষয়ে ভাল কি কি তা ভেবে দেখি" (বি পজিটিভ বি হ্যাপি)

বচন-৪ঃ  -কাল তিনটা না আরো একটা আছে

-শুন্য কাল

( এক পল্লী গায়কের বরাত দিয়ে)

এই শুন্য কাল থেকে আমরা কবে বের হয়ে আসবো)

বচন-৫ঃ(আলবেয়ার কামুর উপন্যাস দ্যা প্লেগ থেকে উদ্ধৃত করে, পত্রিকার সম্পাদককে এক সাহসী সাংবাদিকের বলা উক্তি )

-যে কথা হাতে রেখে বলা হয়,সে কথায় আমার কোন উৎসাহ নেই..  আমি আমার পরিপার্শ্বের জগত নিয়ে ক্লান্ত ও অসুস্থ- সত্যকে গোপন বা বিকৃত করা এবং অবিচার -অন্যায়ের মধ্যে বাস করা, এমন সমাজের সঙ্গে কোন সম্পর্কই রাখবো না।
সৈয়দ হক এরপর মন্তব্য করেন-"আমাদেরও যেন এমন দিন না আসে,আমাদেরও যেন বলতে না হয়,এমন সমাজের সঙ্গে সম্পর্কই রাখবো না।

( হায় সেদিন কি আসেনি?)

আমি ও বর্তমান সমাজ নিয়ে ক্লান্ত ও অসুস্থ -তাই  পচনশীল সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবো না এ ঘোষণা প্রকাশ্যেই  দিয়েছি
( সময় পেলে পাবলিক লাইব্রেরিতে আসি বই পড়তে। আজ পড়ছিলাম প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকের "স্বর্গের পথ নির্জন " বইটি। সেখান থেকে লাইব্রেরিতে বসেই এ পোস্ট দিলাম)

Sunday, October 21, 2018

রোগ কাহিনী -৩৫ঃ শালি-দুলাভাই মাখামাখি বনাম স্বামীর হ্রদয়ে রক্তক্ষরণ

কাহিনী সংক্ষেপঃ
আমিন সাহেব, বয়স ৪০। ১৩ বছর হলো বিবাহিত জীবন। ১ছেলেও ১ মেয়ের জনক।

বিয়ের পর থেকেই তিনি লক্ষ করেন তার স্ত্রী তার বড় দুলাভাইয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত মাখামাখি করে থাকে।
যেমন -
গলা জড়িয়ে বসে থাকে,
নিজ হাত দুলাভাইকে সযত্নে খাইয়ে দেয়
, এক সাথে বিছানায় শুয়ে থাকে
,দুলাভাইয়ের পায়ের উপর পা দিয়ে বসে খেতো,

দুলাভাইয়ের গালে ঠোকনা দেয়,শরীরে চিমটি কাটে ইত্যাদি।
এসব তার মোটেই পছন্দ নয়।
সে স্ত্রীকে এভাবে "পর পুরুষের" সঙ্গে ঘেষাঘেষি না করতে নিষেধ করেন।

কিন্তু স্ত্রী তার কথা মানে না।
তাকে গুরুত্ব দেয় না,তার তেমন যত্ন নেয় না বরং তার সামনেই দুলাভাইয়ের সঙ্গে নষ্টামি করে থাকে।

এ নিয়ে তিনি শ্বশুরকে বলেন কিন্তু তিনি উল্টো তাকে শাসায়।বলে  তুমি কয় টাকা উপার্জন করো যে আমার বড় জামাইয়ের বিরুদ্ধে বলছো( তখন তিনি বেকার ছিল না) এমন ভালো জামাইয়ের বদনাম করছো।

তারা উনাকে বেয়াদব বলেন।

উনি আরো জানতে পারেন যে তার ছোট শালির সঙ্গে ঐ দুলাভাইয়ের শারীরিক সম্পর্ক ও ছিল যা নাকি তার স্ত্রীর সামনেই একজন তাকে বলে

।এতে তিনি আরো জোর দিয়ে স্ত্রীকে ঐ লোকের সঙ্গে মিশতে মানা করেন। তবে তার স্ত্রী তাতে মোটেই কর্নপাত করেনি।

তার ফ্যামিলি ও এগুলো জেনে যায়।তারা ও ঐ লোকের সঙ্গে মিশতে মানা করেন। তাতে ও কোন কাজ হয়নি।

তিনি চাকরি পাওয়ার পর তার স্ত্রীকে আর শ্বশুর বাড়িতে যেতে দেননি। গত ৮ বছর যাবত তার স্ত্রীকে তার বাপের বাড়িতে যেতে দিচ্ছে না।

শ্বশুড় বাড়ীর লোকদের বলে দিয়েছি আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসে থাকি মেয়েকে দেখতে চাইলে ঐ সময় আসবেন, আমার সাথে যাতে দেখা না হয়।

তার ভাষ্য শ্বশুর বাড়ির কাউকে দেখলে বিশেষ করে শ্বাশুড়িকে দেখলে মনে হয় এদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলি।

সে বলে সে সময় এমন কষ্ট লাগতো মনে হয় সন্তান মারা গেলে ও এমন কষ্ট হতো না।

অথচ এতো দিন পর ও তার মনে ঐ অতীত স্মৃতি বারবার মনে আসে।

বিশেষ করে যখন কোন পুরুষকে দেখে অন্য নারীদের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করছে তখন ঐ ব্যাটার(দুলাভাইয়ের) লুচ্চামির কথা  মনে পরে যায়।

আবার যখন কোন নারীকে দেখি তার স্বামীকে আদর,ভালোবাসা দিয়ে সুখী সংসার করছে তখন ও মনে ক্ষেদ জমে, আমি এমন হতভাগা কেন ছিলাম, আমার জীবনে এমন বউ কেন পেলাম না।

এতো দিন পর কেন এসেছেন জিজ্ঞেস করলে বলেন, স্যার এখন আর সহ্য হচ্ছে না।

আগে কষ্ট হতো তবে এখন ঐ কষ্ট নিতে পারি না

।একেকবার মনে হয় সন্তানদের মেরে নিজে আত্মহত্যা করি।

এখন কি সমস্যা জিজ্ঞেস করলে বলে

- যখনই ঐ কথা গুলো মনে পরে
মাথায় চাপ লাগে,
ঝিম ধরে বসে থাকি,
শরীরে ব্যালান্স থাকে না,,
রাগ উঠে
,সামান্য কারনে স্ত্রীর উপর ক্ষেপে যাই,
মনে হয় আত্মহত্যা করি,
অনবরত সিগারেট খেতে থাকি,
অন্যমনস্ক হয়ে যাই যার জন্য মোটর সাইকেল চালানো বন্ধ করে দিয়েছি এক্সিডেন্ট এর ভয়ে।

অবসেশন কিনা বোঝার জন্য জিজ্ঞেস করলাম এ চিন্তা গুলোকে ভুল মনে করেন কিনা।

উত্তরে বলে না।এগুলো আমার নিজ চোখে দেখা জিনিস কিভাবে ভুল মনে করবো।

স্ত্রী কি বলে জানতে চাইলে বলেন,সে এটিকে গুরুত্ব দেয় না এমনকি নিজের অতীতের জন্য দুঃখ প্রকাশ ও করে না।

তার আকুতি
স্যার স্বপ্নেও দেখি তাদের কুকর্ম,
কিছুতেই ভুলতে পারছি না,
মনে হয় সন্তানদের মেরে নিজে আত্মহত্যা করি।

এই কেইস হিস্ট্রি থেকে কি শিখলাম?

১।আমাদের দেশে অভিভাবকরা মেয়েকে কোন তরুণ যুবকের সঙ্গে মিশতে দেন না এই ভয়ে না জানি কি কুকর্ম করে বসে।

কিন্তু শালি দুলাভাই সম্পর্ককে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হয় যেন সব দুলাভাইরা ফেরেশতা।

২। ক্ষমতা, অর্থের আধিপত্য সবখানেই। এমনকি মেয়ের জামাইদের মধ্যে ও এই বৈষম্য করা হয়।

৩। অভিভাবক যদি  কোন পুরুষের  সঙ্গে মাখামাখিকে "নিরাপদ " মনে করে লাইসেন্স দিয়ে দেয় তাহলে তার সুযোগ ঐ চরিত্রবান পুরুষ নিতে কার্পণ্য করবে না।

আমি এমন কেইসও জানি দুলাভাই দ্বারা প্রেগন্যান্ট ও হয়ে গেছে। অবাক হবার বিষয় মা বাবা সেগুলোকে "তেমন কিছু না" বলে হাল্কা করে দেখে।
অনেক সময় মেয়েকে উল্টো শাসায় কেন মুরুব্বি দুলাভাইয়ের নামে বদনাম করছে।

৪। মূল কথাঃ
কোন কষ্টদায়ক তিক্ত অভিজ্ঞতা বা ভয়াবহ স্মৃতি মানুষের মস্তিষ্কে বড় ধরনের "আঘাত" সৃষ্টি করে ( মেন্টাল ট্রমা)।

কারো কারো ক্ষেত্রে সে ট্রমা সারাজীবন তাকে ক্ষত বিক্ষত করে থাকে। সেই দুঃসহ স্মৃতি তার জীবনকে তচনচ করে দেয়।

৫। বিশেষ ঘটনা, যা ঐ স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে পারে, ট্রিগার হিসেবে কাজ করে ও ঐ কষ্টদায়ক ঘটনা "জীবন্ত " হয়ে তার মানস জগতে টর্নেডোর মতন আঘাত করে।
সে স্মৃতি এমনকি স্বপ্নের ভিতর ও বারবার হানা দিতে  পারে।

৬। দাম্পত্য জীবনে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে এমন " কাটা" রেখে কখনো  কেউ সুখী হতে পারে না

।তাদের উভয়েরই উচিত ছিল এ "ক্ষত" নিরাময়ে প্রফেশনাল সাহায্য নেওয়া।
দেরীতে হলেও উনি আমার কাছে এসেছেন, তাই সাধুবাদ জানাই।

কিন্তু যারা প্রতিদিন কোন কষ্ট নিয়ে দিনাতিপাত করছেন তাদের এই কষ্ট বহন করে চললে এক সময় আত্মহত্যা বা অন্যকে হত্যার ঝুঁকি থাকে।

আমরা কি সাবধান হবো না?

Saturday, October 13, 2018

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা-৩ঃআবেগীয় মস্তিষ্ক

এক দম্পতির ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে ছিল "সেরিব্রাল পালসির" রোগী। এ ধরনের রোগী একদলা মাংস ছাড়া আর কিছু না।মানসিক প্রতিবন্ধীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে এ রোগ।হুইল চেয়ারে ঐ মেয়েকে নিয়ে তারা ট্রেনে করে যাচ্ছিল।হঠাৎ ট্রেনটি দুর্ঘটনায় ব্রীজ ভেঙ্গে নদীতে পরে যায়।যখন কামরায় পানি দ্রুত বেগে ঢুকতে লাগলো তখন ঐ মা বাবা জানালা দিয়ে কোন রকমে ধাক্কা মেরে ঐ প্রতিবন্ধি মেয়েকে উদ্ধার কর্মীদের কাছে ফেলে দেয়।এর পর পরই তারা দুজন ডুবে মারা যান।
যে সন্তানের কোন ভবিষ্যত নেই, তারা না থাকলে যার বেচে থেকে ও লাভ নেই, তবুও মা বাবা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে ঐ প্রতিবন্ধী মেয়ের জীবন রক্ষার জন্য।

বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীদের মতে সন্তানদের প্রতি মা বাবার এরকম চরম আত্ম ত্যাগের পিছনে রয়েছে " প্রজনন সফলতার "(reproductive success)  তাগিদ। অর্থাৎ এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে বংশধারার " জিন" সন্চালিত করে দেওয়ার তাগিদ।

কিন্তু আসলেই কি এটি নিছক তেমন স্বার্থপরতা?

মূলত ক্রাইসিস মুহূর্তে মা বাবার এ এরকম  আত্মত্যাগ "নিখাদ ভালোবাসা " ছাড়া আর কিছু নয়।
এটি হচ্ছে "পরহিতের জন্য ভালোবাসা " (এলট্রুস্টিক লাভ)।

এতে প্রমানিত হয় আমাদের গভীরতম অনুভূতি, অনুরাগ ও আকাঙ্খাগুলো হচ্ছে আমাদের জীবনের অত্যাবশ্যকীয় গাইড।মানব অস্তিত্ব টিকে থাকার পিছনে এসবের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

এই ক্ষমতা অতুলনীয়। একমাত্র নিখাদ ভালবাসা  ছিল ঐ সন্তানকে রক্ষা করার আন্তরিক তাগিদ,যা নিজেদের রক্ষা করার তাড়নাকে দমিয়ে রেখেছে।
নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে দেখলে এই আত্মত্যাগ ছিল অযৌক্তিক( ইররেশনাল)। কিন্তু অন্তর দিয়ে দেখলে এটি ছিল একমাত্র "চয়েজ" যা তারা নিতে পারতো।

যখন তীব্র আবেগ যুক্তিকে হারিয়ে দেয়ঃ

"মানুষ সঠিক ভাবে দেখতে পারে (শুধু)  হ্রদয় দিয়ে (চক্ষু দিয়ে নয়)। যা কিছু অত্যাবশ্যকীয় তা তা চর্ম চোখে অদৃশ্য থাকে "- antoine De Saint Exuoprey

আমাদের বিবর্তনের আবেগীয় ইতিহাস হচ্ছে " ভয়"। এই ভয়ের কারনে আমরা পরিবারকে ও নিজকে বিপদ থেকে রক্ষার জন্য শক্তি সামর্থ্য জড়ো করি।
বিপদের সময় তাৎক্ষণিক ভাবে স্বতস্ফূর্তভাবে সাড়া দেওয়ার প্রবনতা, আমাদের স্নায়ু সিস্টেমে গ্রোথিত রয়েছে।

আদিমকালে মানব পূর্ব পুরুষরা এমন ক্রান্তিকাল কাটিয়েছে, যখন তারা শুধু "অস্তিত্ব ও মৃত্যুর " পার্থক্য বুঝতো।
একই সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে ভাবতো যারা তাদের বংশধারা অব্যাহত রাখবে।
এসব কারনে যখন নিজের বা পরিবারের কারো অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হতো, তারা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া করতো নিজেদের রক্ষা করার জন্য।

এই আদিম প্রবৃত্তি এখনো আমাদের স্বভাবে দৃড়মূল হয়ে রয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে সমাজ সভ্যতার এতো অগ্রগতি হয়েছে যে পুরনো বিবর্তনের গতি তাকে ধরতে পারছে না।

আমরা বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে যতো অগ্রসর হচ্ছি সাংস্কৃতিক, মানবিক দিক থেকে তত অগ্রগতি হয়নি।
কিছু কিছু সামাজিক নিরোধমূলক নৈতিকতা সমাজ গ্রহণ করেছে বটে, তবে তা আমাদের মূল প্রবৃত্তি দমনে তেমন কার্যকর নয়।

আমরা এখনো আবেগীয় প্রতিক্রিয়া করি হাজার হাজার বছর আগেকার প্রকৃতি অনুযায়ী, আধুনিক সভ্যতায় যেমন  হওয়া উচিত ছিল তেমনভাবে নয়।

মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড তার " Civilization and It's discontents" -বইতে উল্লেখ করেন,

সমাজকে বাহির থেকে "রীতি -আইন - কানুন" প্রয়োগ করতে হয়েছে যাতে মানুষ তার অতিরিক্ত "আবেগের ঢেউকে" সামলে রাখতে পারে।

এইরকম "সামাজিক নিরোধ" ব্যবস্থা থাকা সত্বেও প্রায়ই যুক্তির চেয়ে তীব্র আবেগ /প্রেষনা আমাদের প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করে থাকে।
মানুষ কেন এরকম প্রকৃতির হলো?

এর কারন হচ্ছে  মানুষের "মানসিক জগতের আর্কিটেকচার বা স্থাপত্য নকশা"।

এগুলো হচ্ছে আমাদের আবেগের "বেসিক নিউরাল সার্কিট্রি"।

আমরা জন্ম গ্রহণ করি সেই সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে, যেগুলো  ৫০ হাজার প্রজন্মের আগে মানুষের জন্য সর্বোত্তম ছিল। তখন পশুর সঙ্গে পাশবিক আচরণ করেই মানুষকে টিকে থাকতে হতো।

অথচ আমরা ভাবি আমরা জন্ম গ্রহণ করি গত কয়েক প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য নিয়ে।

মানুষের আবেগীয়,সাংস্কৃতিক ও মানবিক বিবর্তন এর হার হচ্ছে খুবই  শ্লথ গতিতে,কিন্ত   আমাদের বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশ হচ্ছে তার চেয়ে সহস্র গুন বেশি হারে।
গত ১০ হাজার বছরে মানব সভ্যতার দুরুত অগ্রগতি হয়েছে এবং জনসংখ্যা ও বিপুল হারে বেড়েছে ( ৫০ লক্ষ থেকে ৭০০ কোটি) ।

কিন্তু এসব অগ্রগতির খুব কমই " দাগ" পড়েছে আমাদের জৈবিক কাঠামোতে ও আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে।

তাই বিস্মিত হওয়ার কারন নেই এটা ভেবে যে, মানুষ এখনো কেন এতো নিষ্ঠুর, নির্মম,অমানবিক ও পাশবিক আচরণ করে।

আমরা বিবর্তিত হচ্ছি খুবই ধীর গতিতে,যে গতি বাড়াতে পারতো সমাজ,রাস্ট্রের নির্ধারকেরা।

মানবিক, সংস্কৃতিবান,হ্রদয়বান ও সৃজনশীল মানুষ যদি সমাজ, প্রশাসনের সর্বস্তরে ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকতে পারতো, তাহলে এই "মানবিক বিবর্তন " আরো জোরদার গতিতে হতে পারতো।

কবে পাবো সে সমাজ,
কবে তৈরি  হবে সে মানবিক জৈবিক কাঠামো?
(পর্ব-৪ঃআসছে)

Sunday, October 7, 2018

রোগ কাহিনী -৩৪ঃস্যার বাংলাদেশের বড় বড় ডাক্তাররা বলে তোমার কোন রোগ নাই, সিঙ্গাপুরের ডাক্তার দেরি না করে বলে তোমার মানসিক রোগ-সর্বাঙ্গে ব্যথা-অষুধ দেবো কোথা

কাহিনী সংক্ষেপঃ
আজাদ সাহেব, বয়স ৪৬ বছর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।১০ বছর যাবত তিনি এই রোগে ভুগছেন।

বিয়ের আগ থেকেই উনার সমস্যা দেখা দেয় যে উনি একা ঘরে ঘুমাতে ভয় পেতেন এবং এর জন্য সব সময় সঙ্গে লোক নিয়ে ঘুমাতে হতো।
তার এই ভয় এখনো আছে।বউ ছাড়া একা ঘুমাতে পারেন না।

এর কিছু দিন পর তিনি শরীরে চিন চিন ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন,ক্রমশ যা অসহ্য যন্ত্রনায় রূপ লাভ করে।

পুরো শরীরই যন্ত্রনা করতো। তবে বেশি হতো হাতে। দিনে মোটামোটি থাকতো, এমনকি ঘুমাতে যেতো ভালই। কিন্তু মাঝ রাতে বা শেষ রাতে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে জেগে যেতো।

এরপর আর ঘুম আসতো না।বউকে বলতো শরীর টিপে দিতে। বউ সারা রাত হাত পা শরীর টিপতে থাকতো। সকাল ৯-১০ টার দিকে ক্লান্ত হয়ে সে ঘুমিয়ে পরতো।

তিনি আরো জানান শরীরে শক্তি পাই না,ভারী কিছু হাত দিয়ে উঠালেও হাতে টের পাই না,মাংসপেশিতে চাপ লাগে না।
টেনশন করলে যন্ত্রনা বাড়ে তবে কাজ করলে ভাল থাকি। ঘুম হয় না,অস্হির লাগে।

একসময় ব্যথা তীব্রতর হয়।সীমাহীন যন্ত্রনা।

দেশের বিখ্যাত সব মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, নিউরো বিশেষজ্ঞ, হাড়-বাত বিশেষজ্ঞ গনকে দেখানো হয়।এ হেন টেস্ট নাই করা হয় নাই।

কিন্তু বড় বড় ডাক্তাররা বলে রিপোর্ট ভাল, আমার কোন রোগ নাই।

এরপর আত্মীয়দের পরামর্শে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান। সেখানকার ডা. তাকে দেখে বলেন,আপনার ঐ ধরনের মারাত্মক কোন রোগ হয়নি। তেমন হলে এতো দিনে মারা যেতেন,সিঙ্গাপুরে আর আসতে পারতেন না

আপনার এটি মানসিক রোগ।

তিনি মাত্র একটি ঔষধ লিখে দেন( পারক্সেটিন- যা একটি এন্টিডিপ্রেসেন্ট)।

এই একটি ট্যাবলেট খেয়েই তিনি ২-৩ বছর ভাল ছিলেন।
কিন্তু এখন আবার ও সে যন্ত্রনা ফিরে এসেছে।

তবে টাকার অভাবে সিঙ্গাপুর যেতে পারছেন না এবং ঐ আগের ঔষধে তেমন কাজ করছে না।

আমাকে বললো, স্যার আপনার অনেক সুনাম শুনে এসেছি, আপনি নাকি ভাল কাউন্সিলিং করেন।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম ঐ যন্ত্রনার সময়ে আপনার মন কেমন থাকতো? 

তিনি বলেন -অস্থির, অশান্তি লাগতো।বউ বলে খিটখিটে মেজাজ হয়ে যেতো।
মনে আনন্দ, ফুর্তি থাকতো না;
কাজে আগ্রহ পেতো না,
ঘুম হতো না;
কোন কিছু নিয়ে ভাবলে ব্যথা শুরু হতো ও বেশি হতো ;
(যেমন-কেউ খারাপ ব্যবহার করলে, কেউ খামোখা ঝগড়া বাধালে,বউ বাচ্চাদের বকা দিলে বা সংসারের কাজে অবহেলা করলে) ।

বউ বলে-
সে দায়িত্বের প্রতি সিরিয়াস ;
নিয়ম কানুন না মানলে ক্ষেপে যায়;
বাচ্চাদের ধমক দিতে দেয় না,
সময় মতন কাজ না করলে রেগে যায়
এবং বাচ্চাদের ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাবে বলে উদ্বিগ্ন থাকে।
তবে একটি ব্যতিক্রমী লক্ষণ তিনি উল্লেখ করেন যে, ঐ যন্ত্রনার সময়ে ও ওনার যৌন চাহিদা বেশি থাকে, যা তার বউও স্বীকার করে।

কেইস হিস্ট্রি থেকে কি শিখলাম?

১। মানসিক রোগ মানে তথাকথিত পাগলামি নয়।সবদিক থেকে স্বাভাবিক মানুষ ও মানসিক রোগী হতে পারে। মানসিক রোগীদের মাত্র ১% সাইকোসিস বাকি ৯৯% হচ্ছে এরকম স্বাভাবিক মানুষ।

২। ব্যথা - মানসিক রোগের একটি অন্যতম  লক্ষণ।

অনেক মানসিক রোগে শারীরিক ব্যথা /যন্ত্রনা থাকতে পারে। বিশেষ করে ডিপ্রেশন, সোমাটোফরম পেইন ডিজঅর্ডার এ এরকম দীর্ঘ স্হায়ী ব্যথা থাকে

৩। কেউ শারীরিক সমস্যা / লক্ষণ নিয়ে দিনের পর দিন ভুগছে,
অনেক ডাক্তার দেখাচ্ছে, কিন্তু তেমন ভাল ফল পাচ্ছে না,
যাবতীয় দামী দামী টেস্ট করেও ডাক্তার বলছে রিপোর্ট ভাল, কোন রোগ নাই---

এমন ক্ষেত্রে নিজেই বুঝে নিবেেন এটি একটি মানসিক রোগ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

৪। ৩ এর মতন রোগীদের কোন রোগ নাই বললে যেমন অন্যায় হবে, তেমনি এটি রোগকে জটিল করে তুলবে ও রোগীকে আত্মীয়দের কাছে তাকেছোট করা হবে।

মানুষ যে লক্ষণ নিয়েই আসুক,সেটি তার সমস্যা ও রোগ।
সেটি শারীরিক রোগ না বলে,টেস্ট ভাল বলে, এটি কোন রোগ নয় বলা অন্যায়।
ডাক্তাররা এমন ভুল করলে রোগীদের যন্ত্রনা শুধু দীর্ঘ স্হায়ী হয় তা না,বিদেশে আমাদের ডাক্তারদের বদনাম ও হয়।একারনে কিছু রোগীর কাছে আমরা আস্হা হারাই।

৫। ঐ রোগীর "অবসেশনাল" ব্যক্তিত্বের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে
(অতিরিক্ত দায়িত্বশীল,নিয়ম কানুনে অনড়,অনিয়ম দেখলে ক্ষিপ্ত হওয়া)।

অবসেশনাল ব্যক্তিদের " পারফেক্ট " হওয়ার প্রবনতা থাকে এবং এদের মধ্যে ডিপ্রেশন হওয়ার ও দীর্ঘ স্হায়ী আবেগ -আচরণ গত সমস্যা ( সাইকোজেনিক পেইন) ঝুঁকি বেশি থাকে।

৬। উনি ডিপ্রেশন এর রোগী। পুরো শরীরে ব্যথা বলে ডাক্তাররা এই রোগের চিন্তা মাথায় আনেনি। অথচ ডিপ্রেশনে বিভিন্ন রকমের শারীরিক লক্ষণ থাকতে পারে,বিশেষ করে বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা এর অন্যতম একটি লক্ষণ
৭। ডাক্তাররা  ও সমাজ শারীরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়,মানসিক সমস্যাকে নয়।একারনে রোগীদের মধ্যে মানসিক যন্ত্রনা শারীরিক লক্ষণ হয়ে প্রকাশ পায়।একে বলা হয় " সোমাটাইজেশন"। আমাদের মতন উন্নয়নশীল দেশে তাই বেশির ভাগ মানসিক রোগী শারীরিক সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে হাজির হন।